চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মোরশেদ। চার বছর আগে অনেক আশা নিয়ে গিয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। চাকরি নিয়েছিলেন দুবাইয়ের একটি রেস্তোরাঁয়। সেখানে যা বেতন পেতেন, সেটা দিয়ে দেশে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বদলে দিয়েছে তার জীবনের সমীকরণ। আকস্মিকভাবে রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে দেশে।
‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রেস্টুরেন্টে বেচাবিক্রি একেবারে কমে গেছিল। আবার বিভিন্ন জায়গায় হামলাও হচ্ছিল। সেকারণে মালিক রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিয়ে কর্মচারীদের সবাইরে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠায় দিছে,’ বলছিলেন মোরশেদ। গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে দুবাই থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ফেরার সময় এক মাসের বেতন হাতে পেলেও আবার কবে দুবাই ফিরে কাজে যোগ দিতে পারবেন, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। ‘দেশে পাঠানোর সময় মালিকে বলছিলো, যুদ্ধ থামলে পরিস্থিতি একটু নরমাল হলে রেস্টুরেন্ট আবার খুলবে, তখন আমাদের জানানো হবে। এখন শুনতেছি যুদ্ধ থামছে, কিন্তু কিছুই তো জানালো না,’ বলেন মোরশেদ।
এদিকে, মোরশেদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল তার পুরো পরিবার। কিন্তু চাকরি না থাকায় এখন সংসার কীভাবে চলবে, সেটি নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ‘হঠাৎ করে চলে আসার কারণে সেভাবে টাকা-পয়সা সঙ্গে আনতে পারি নাই। কাছে যা টাকা আছে, সেটা দিয়ে বেশিদিন চলাও যাবে না। সামনে কীভাবে যে সংসার চলবে, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।’
বস্তুত: গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে। একদিকে, মোরশেদের মতো অসংখ্য শ্রমিক যেমন চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন, তেমনি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তি রপ্তানির হার। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসেবে, গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ কাজ করতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ‘ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সেই সংখ্যাটা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে,’ বলেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান।
এ অবস্থায় দ্রুত জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প বাজার তৈরি করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসী আয়ের ওপর যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেইসঙ্গে অবৈধপথে বিদেশ যাত্রা বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালালে জবাবে পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান। ইসরাইলের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও মার্কিন দফতর লক্ষ্য চলতে থাকে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই অঞ্চলে মার্কিন মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন এবং কুয়েত। অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি কোথাও কোথাও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এতে নিরাপত্তা শঙ্কায় বন্ধ হয়ে যায় অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান।
টানা ৪০ দিন সংঘাত চলার পর এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরপর স্থায়ীভাবে যুদ্ধের ইতি টানার উদ্দেশ্যে গত একমাসে দফায় দফায় শান্তি আলোচনা করলেও দু'পক্ষ এখনও চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় থেমেছে পাল্টাপাল্টি হামলা। ফলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ‘যুদ্ধের কারণে যেসব এলাকায় দোকান-পাট, অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেছিলো, সেগুলো এখন আস্তে আস্তে চালু হচ্ছে,’ বলেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ফরহাদ মোহাম্মদ। দুবাই শহরে মোহাম্মদের শো-পিস বা ঘর সাজানোর সামগ্রীর একটি দোকান রয়েছে। সেটি আপাতত খোলা রাখা গেলেও আগের মতো বেচাবিক্রি নাই বলে জানান তিনি, ‘আমাদের এখানে মূলত কাস্টমার ছিলো ফরেন ভিজিটররা (বিদেশি দর্শনার্থীরা)। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ভিজিটরের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ফলে বেচাবিক্রিও সেভাবে হচ্ছে না।’
সৌদি আরব, কাতারসহ অন্য দেশগুলোতেও একই অবস্থা বলে জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ‘এখানেই ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো না। মালিকদের অনেকে ঠিকঠাক বেতন দিতে না পেরে লোক ছাঁটাই করে দিচ্ছে বলে শুনতেছি। এটা নিয়ে আমরাও ভয়ে আছি,’ বলেছেন সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক হায়দার আলী। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক বড় অংশই কাজ করেন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানান কারণে নির্মাণ শিল্পের মালামাল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। ‘এর ফলে আমরা রেগুলার কাজ পাচ্ছি না। আরও কিছুদিন এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকা লাগবে,’ বলেন কাতার প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক নাজমুল হোসেন। এর মধ্যে আবার খাবার-দাবারসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে।
সংকট বহুমাত্রিক
বাংলাদেশের এক কোটি জনশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। এর মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে সাত লাখ, কাতারে সাড়ে চার লাখ, বাহরাইনে দেড় লাখ এবং কুয়েতে প্রায় দেড় লাখ প্রবাসী কর্মী আছেন বলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যে ১১ লাখ ৩২ হাজার কর্মী বিদেশে কাজে গেছেন, তাদের মধ্যেও সোয়া নয় লাখের বেশি গেছেন জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে। ফলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ওইসব দেশের অবদান দেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) মোট প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩৪৪ কোটি টাকা, যা মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
‘কিন্তু যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ওইসব দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই সেটির একটা নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর পড়বে,’ বলেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক হাসান। যদিও যুদ্ধের মধ্যেও গত কয়েক মাসে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে ঢুকেছে বলে জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ গত এপ্রিলেও তিনশ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ‘দুই ঈদের আগে প্রতিবছরই রেমিট্যান্স বেশি আসে। এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় প্রবাসীরা তাদের জমানো অর্থও দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যার ফলে আপাতত মনে হচ্ছে, রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু নেতিবাচক প্রভাবটা আসলে টের পাওয়া যাবে আরও পরে, দীর্ঘমেয়াদে,’ বলছিলেন হাসান। ইতোমধ্যেই অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। আবার ভিসা না পাওয়া, ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটাসহ নানান কারণে অসংখ্য কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে যেতে পারছেন না। সব মিলিয়ে জনশক্তিখাত বহুমাত্রিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প বাজার অনুসন্ধানের প্রতি জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশই আসে রেমিট্যান্স থেকে। কাজেই এটা ঝুঁকিমুক্ত রাখতে না পারলে অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়বে। আর রেমিট্যান্সের ঝুঁকি কমাতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প বাজার অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
কী বলছে সরকার?
ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তির বাজারে যে সংকট দেখা দিয়েছে, সরকারও সেটি স্বীকার করছে, ‘এটা তো আসলে অস্বীকার করা উপায় নেই। তবে আমরা আশা করছি, যুদ্ধ থেমে গেছে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে,’ বলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সহসাই কাটবে না বলে ধারণা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, ‘গত কয়েক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার বা সৌদি আরব বিনিয়োগ ও ভ্রমণের জন্য একটা নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে যে ভারমূর্তি তৈরি করেছিল, সেটা এবারের যুদ্ধে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’ ফলে আগামী কয়েক বছরে মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে মনে হচ্ছে না, বরং তেলের মূল্যবৃদ্ধি খাবারসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেটাও প্রবাসীদের ভোগাবে।
মূলত সেই কারণেই জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প বাজার অনুসন্ধানের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকারও বলছে, বিকল্প বাজার হিসেবে তারা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। ‘এক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই জাপানের সঙ্গে একটি চুক্তি করা হয়েছে। এর আওতায় বর্তমানে অভিবাসন খরচ ছাড়াই কারিগরি ইন্টার্ন হিসেবে অনেক কর্মীকে জাপানে পাঠানো হচ্ছে। এভাবে আগামী পাঁচ বছরে সেদেশে অন্তত এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে,’ বলেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। জনশক্তি রপ্তানি সহজ করতে সরকার ডজনেরও বেশি দেশের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু জাপান কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে কর্মী রপ্তানির জন্য প্রয়োজন বিভিন্নখাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। সেদিকে কতটা নজর দিচ্ছে সরকার? দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ছয়টি সামুদ্রিক প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সেইসঙ্গে, বিভিন্ন দেশের ভাষা শেখানোর জন্যও আলাদা কর্মসূচি চালু রয়েছে।
জঙ্গিবাদ, যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। এসব বন্ধ শ্রমবাজার চালু করার পাশাপাশি বিকল্প বাজার তৈরি করতে না পারলে ঝুঁকিপূর্ণ পথে অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রা বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান। সরকার বলছে, বন্ধ শ্রমবাজার চালুর জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেইসঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে রোমানিয়া, পর্তুগাল, সেশেলস, জাপান, রাশিয়াসহ নতুন আরও বেশকিছু গন্তব্যে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়।



