যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিলেও কিছু বহুজাতিক কোম্পানি এই অস্থিরতাকে পুঁজি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড মুনাফা অর্জন করছে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা একদিকে যেমন বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি খাতে অভাবনীয় মুনাফা
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের বাণিজ্যিক হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে ইউরোপীয় তেল জায়ান্টরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, যার সুযোগ নিয়েছে বিপি এবং শেলের মতো কোম্পানিগুলো। বছরের প্রথম তিন মাসে বিপি-র মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে শেল ৬.৯২ বিলিয়ন ডলার এবং টোটাল এনার্জি ৫.৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জন করেছে। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে মার্কিন জায়ান্ট এক্সনমোবিল ও শেভরনের আয় গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমলেও তারা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে এবং তেলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ভবিষ্যতে আরও বড় মুনাফার আশা করছে।
আর্থিক খাতে রেকর্ড আয়
শেয়ার ও বন্ড বাজারে বিনিয়োগকারীদের অস্থিরতা এবং নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বড় ব্যাংকগুলোর আয় বাড়িয়ে দিয়েছে। জেপি মর্গান ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ১১.৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যা ব্যাংকটির ইতিহাসে অন্যতম সেরা প্রান্তিক আয়। গোল্ডম্যান স্যাকস এবং মরগান স্ট্যানলির মতো বড় ছয়টি মার্কিন ব্যাংক সম্মিলিতভাবে বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৪৭.৭ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। মূলত বাজারের অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচার ধুম বা ট্রেডিং ভলিউম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এই বিশাল অংকের কমিশন ও মুনাফা পেয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতের বড় অর্ডার
ইরান যুদ্ধের ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন মোকাবিলা প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে। বিএই সিস্টেমস, লকহিড মার্টিন এবং বোয়িংয়ের মতো বড় ঠিকাদাররা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্ডার হাতে পাওয়ার কথা জানিয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ায় বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের অস্ত্রভাণ্ডার নতুন করে পূর্ণ করতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। সমরাস্ত্র নির্মাতারা একে তাদের ব্যবসার জন্য একটি সহায়ক প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উত্থান
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই যুদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকেও গতিশীল করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ থেকে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফ্লোরিডা ভিত্তিক নেক্সটএরা এনার্জি বা ডেনমার্কের ভেস্টাসের মতো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যে সৌর প্যানেলের বিক্রি ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং পেট্রোলের উচ্চমূল্যের কারণে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চাহিদাও বেড়েছে ব্যাপক।
সব মিলিয়ে যেখানে সাধারণ মানুষ উচ্চমূল্যের বাজারে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে যুদ্ধের উত্তাপ বড় কর্পোরেশনগুলোর সিন্দুকে বিলিয়ন ডলারের জোগান দিচ্ছে। সূত্র: বিবিসি।



