মৌসুমের নির্ধারিত সময়ের আগেই পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে উঠতে শুরু করেছে রসালো ফল লিচু। তবে এসব লিচুর সিংহভাগই অপরিণত বা অপরিপক্ব। অধিক মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে এসব লিচু বড় করে ও পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাবনায় লিচু উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, পাবনা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লিচু উৎপাদনকারী জেলা। এ বছর জেলায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ এবং ৩৫ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। পাবনার ঈশ্বরদী, সদর, আটঘরিয়া, চাটমোহর এবং সুজানগর উপজেলায় বেশি লিচু উৎপাদন হয়ে থাকে। জেলার চাষিরা সবচেয়ে বেশি আবাদ করছেন বোম্বাই জাতের লিচু। মূলত ঈশ্বরদীর বোম্বাই লিচুর কদর দেশ জোড়া। অন্যান্য জাতের মধ্যে বেদানা, কদমী, দেশি আঁটি বা মোজাফফরী, চায়না-থ্রি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
অপরিপক্ব লিচু সংগ্রহের প্রবণতা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, বোম্বাই লিচু উঠতে আরও কমপক্ষে ৩ সপ্তাহ এবং দেশি জাতের লিচু পাকতে ১০ দিন থেকে ১৪ দিন সময় লাগবে। এদিকে বেশি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে অপরিপক্ব বা অপরিণত দেশি জাতের লিচু ভেঙে নিয়ে বিক্রি করছেন। প্রসঙ্গত, লিচুর মুকুল ধরার সময় ব্যবসায়ীরা বাগানির কাছ থেকে প্রতিটি গাছ ধরে লিচু কিনে নেন।
বাজারে কেমিক্যালে পাকানো লিচুর প্রভাব
গত দুদিন ধরে পাবনা শহর, দাশুড়িয়া, ঈশ্বরদী, টেবুনিয়া, মুলাডুলিসহ বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাসায়নিক দিয়ে বড় করা ও পাকানো এসব লিচুতে বাজার সয়লাব। বেশ চড়াদামে এসব লিচু বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের প্রথম এবং লোভনীয় ফল হওয়ায় ক্রেতারা এসব লিচু কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। অনেক ক্রেতা জানান, দেখতে লাল টুকটুকে এবং আকর্ষণীয় হলেও এসব লিচুতে কোনো স্বাদ নেই। প্রতি একশো লিচু ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত দেশি আঁটি লিচুর দাম এত হওয়ার কথা নয়। বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে দাম বেশি হওয়ায় তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রশাসনের উদ্বেগ ও ব্যবস্থা
নির্ধারিত সময়ের আগে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো লিচু গাছ থেকে সংগ্রহ ও বিক্রি করার বিষয় নিয়ে রোববার (১০ মে) পাবনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় পাবনা-৫ (সদর) আসনসহ ৩ জন সংসদ সদস্য এবং জেলার সব সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রেস ক্লাব সভাপতি ও সম্পাদকসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞের সতর্কতা
এ সময় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, চায়না থেকে আমদানি করা পিজিআর (প্লান্ট গ্রোথ রেগুলেটর) নামক একটি রাসায়নিক দিয়ে লিচু বড় করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা না জেনে বা না বুঝে এই রাসায়নিক অতিরিক্ত ব্যবহার করছেন; যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পিজিআর ছাড়াও গাছে থাকতেই লিচুতে কয়েক দফা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত
পাবনার বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. ইফতেখার মাহমুদ বলেন, রাসায়নিকযুক্ত লিচু খেলে বৃদ্ধ ও শিশুসহ যাদের পুষ্টির অভাব বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের নানা সমস্যা হতে পারে। কিডনি, লিভার সমস্যা, ডায়রিয়া-আমাশয়সহ গুরুতর রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পূর্ণ মৌসুম না আসা পর্যন্ত জনসাধারণকে লিচু ও অন্যান্য ফল কেনা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।



