খেলতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু। কারও শরীর অস্বাভাবিক গরম হয়ে যাচ্ছে, কেউ পানিশূন্যতায় কাহিল হয়ে পড়ছে, আবার কারও দেখা দিচ্ছে মাথা ঘোরা বা বমির মতো উপসর্গ। দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীর দ্রুত গরম হয়ে যায় এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও তুলনামূলক কম। ফলে গরমকে সামান্য অবহেলা করলেও তা কখনও কখনও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কেন বেশি ঝুঁকিতে শিশু?
শিশুদের শরীরে পানির পরিমাণ দ্রুত কমে যেতে পারে। তারা অনেক সময় তৃষ্ণা পেলেও তা প্রকাশ করতে পারে না বা খেলাধুলার মধ্যে পানি পানের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায়। বিশেষ করে নবজাতক, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং যাদের আগে থেকে শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার নিশ্চিত করা জরুরি
তাপপ্রবাহের সময়ে শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স অনুযায়ী ঘন ঘন পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা অন্যান্য নিরাপদ তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি মেশানো কোমল পানীয় বা কৃত্রিম পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো। শুধু তৃষ্ণা পেলেই নয়, নির্দিষ্ট বিরতিতে শিশুকে পানি পান করাতে হবে। কারণ অনেক শিশু তৃষ্ণা অনুভব করলেও তা বুঝতে পারে না।
রোদে বাইরে যাওয়া সীমিত করা উচিত
সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সাধারণত তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ে শিশুদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া বা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা প্রয়োজন। বাইরে যেতেই হলে ছাতা, টুপি বা মাথা ঢাকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পোশাকে স্বস্তি জরুরি
গরমের সময়ে শিশুদের জন্য হালকা রঙের, ঢিলেঢালা এবং সুতি কাপড়ের পোশাক সবচেয়ে উপযোগী। আঁটসাঁট বা মোটা কাপড় শরীরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ঘরে থাকলেও এমন পোশাক পরানো উচিত যাতে শরীরে বাতাস চলাচল করতে পারে।
ঘরের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ
অনেক অভিভাবক মনে করেন, ঘরের ভেতরে থাকলেই শিশু নিরাপদ। কিন্তু পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকলে ঘরের ভেতরেও শিশুর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। তাই জানালা খুলে রাখা, ফ্যান চালানো এবং ঘরকে তুলনামূলক শীতল রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
কোন লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
তাপজনিত অসুস্থতার কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো— অস্বাভাবিক ক্লান্তি; মাথা ঘোরা; অতিরিক্ত ঘাম বা ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া; বমি বমি ভাব বা বমি; শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া; অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক আচরণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশুকে ঠান্ডা স্থানে নিতে হবে, পানি বা তরল খাবার দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
যদি শিশুর শরীর খুব বেশি গরম হয়ে যায়, জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়, খিঁচুনি দেখা দেয় বা সে স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দেয়, তাহলে বিষয়টিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা
তাপপ্রবাহের সময়ে কখনও শিশুকে বন্ধ গাড়ির ভেতরে একা রেখে যাওয়া উচিত নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। একইসঙ্গে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে গরমের লক্ষণগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শেষ কথা
তাপপ্রবাহ হয়তো সাময়িক, কিন্তু এর প্রভাব শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। তাই গরমকে মৌসুমি অস্বস্তি হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সামান্য সচেতনতা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং রোদে চলাফেরায় সতর্কতা শিশুকে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।



