মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল: দখল ও মাদকের আখড়ায় পরিণত
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত দেশের প্রাচীনতম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি আজ নিজেই এক ভয়াবহ ‘সংক্রামক ব্যাধিতে’ আক্রান্ত। প্রতিষ্ঠানটির নামে বরাদ্দকৃত ৩৩ একর জমির মধ্যে মাত্র তিন একর জায়গা বর্তমানে হাসপাতালের দখলে রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে বাকি জমি পরিণত হয়েছে বস্তি, রিকশা গ্যারেজ, হোটেল ও নানা দোকানপাটের আখড়ায়। পরিবেশ হয়ে উঠেছে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর, যেখানে দিনভর চলে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচা ও সেবন।
চিকিত্সকদের জীবন বাজি, রোগীদের ভোগান্তি
এই অরাজকতার মধ্যেই সংক্রামক নানা রোগের চিকিত্সা দিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় মানুষের যাতায়াত থাকায় কিছুটা ভয় কম লাগলেও সন্ধ্যার পর জীবন বাজি রেখেই তাদের আসা-যাওয়া করতে হয়। দেশে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ব্যাপকহারে বাড়ছে, কিন্তু এই হাসপাতালটি তার পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদের মতে, ‘হাসপাতালটিকে ৫০০ বেডের অত্যাধুনিক হাসপাতালে সম্প্রসারণ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।’
দখল উদ্ধারে চিঠিপত্র, কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অসংখ্যবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো প্রতিকার হয়নি; বরং দখলের বিস্তার ঘটেছে। নতুন নতুন একতলা ভবন ও টিনশেডের ঘর তুলে ভাড়া দিয়ে দখলবাজরা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। হাসপাতাল ঘিরে বহু বছর ধরে এই দখল-পালটা দখলবাজি চলে আসছে, আশপাশে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক বস্তিঘর, যা ‘সাততলা বস্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
- হাসপাতাল জায়গায় গড়ে উঠেছে বস্তিঘর, দোকানপাট, কাঁচাবাজার, ফার্নিচার ও খাবারের হোটেল।
- দিনরাত চলছে মাদক বেচাকেনা ও সেবন, যা ইতিপূর্বে ইত্তেফাকে সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
- প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন মাদক কারবার কমে, কিন্তু কয়েক দিন পর আবার একই পরিবেশ ফিরে আসে।
দখলবাজদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। দখলবাজদের সঙ্গে হাসপাতাল ও গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। তাছাড়া যে দল ক্ষমতায় যায়, সেই দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণে চলে বস্তি ও মাদকের কারবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘এ কারণে কেয়ামত পর্যন্ত এই হাসপাতালটির জায়গা উদ্ধার করা বা মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে হয়।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিগত সকল সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন, ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
হাসপাতালের সেবা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, কুকুর, বানর, বিড়াল, শিয়ালসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণির কামড়ে আহত, ধনুষ্টঙ্কার, ভাইরাল এলকোফলাইটিস, ডিপথেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, এইচআইভি পজিটিভ, জন্ডিস, জলবসন্ত, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিত্সা ও টিকা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস জানান, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি মন্ত্রীর নজরে এসেছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘অবৈধ উচ্ছেদসহ আগামী বাজেটে এই হাসপাতালটির চিকিত্সাসেবা সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
- ১৯৬৫ সালে ‘স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।
- ১৯৭২ সালে হাসপাতালের নামকরণ করা হয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল।
- সম্প্রতি চট্টগ্রামে এরকম আরো একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই হাসপাতালটি যদি পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা দিতে পারে, তবে রাজধানীসহ আশপাশের জেলাসমূহের বাসিন্দাদের জন্য তা হবে এক বিশাল স্বস্তির খবর। কিন্তু দখলমুক্তি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিনই থেকে যাচ্ছে।



