গত এক মাস ধরে একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাভাষী মানুষজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে বেনাপোল সীমান্তে নতুন ঘটনা ঘটেছে। রোববার দিবাগত রাতে যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়ার একটি গেট দিয়ে ১০ নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হস্তক্ষেপ করে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। দলটি এখন বেনাপোল সীমান্তের সাদিপুর গ্রামের বোম্বেটোলা এলাকায় জিরো লাইনে (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকা পড়ে আছে।
বিএসএফের জবাব না পাওয়া
বিজিবি ঘটনার সমাধানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর কাছে চিঠি দিলেও সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএসএফের মাধ্যমে সীমান্তে আনা ১০ জন এখনো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো লাইনে রয়েছেন। বিষয়টি সমাধানে বিএসএফ-এর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হলেও সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
মে মাসে একাধিক সীমান্ত ঘটনা
মে মাস জুড়ে একাধিক সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাভাষী মানুষজনকে 'অবৈধ অভিবাসী' বা 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বলে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই মাসে কতজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বা কতজনকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো সমন্বিত তথ্য বিজিবি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা প্রকাশ করেনি।
ঈদুল আজহার আগে ২৪ মে থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ১০০-এর বেশি নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয় বলে স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর আগে ২৭ মে সাতক্ষীরার কুশখালী সীমান্ত দিয়ে ২৩ জনকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরীছড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। একই সময়ে ধোলা সীমান্ত এলাকা ও আশপাশ থেকে অনুপ্রবেশের সন্দেহে ৫০ জনকে আটক করা হয়। মে মাসের শেষ দিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টার সময় বিজিবি ১০ জনকে আটক করে। এছাড়া মেহেরপুর, যশোর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সীমান্ত এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটে।
সীমান্ত নজরদারি জোরদার
ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ বাড়ায় সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বিজিবি। অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো এবং সীমান্তবর্তী সম্প্রদায়কে নজরদারিতে যুক্ত করা হয়েছে। বিজিবি সদর দফতরের উপমহাপরিচালক ও বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আবু হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'সীমান্ত দিয়ে যারা অবৈধভাবে দেশে ঠেলে দেওয়া হয়, বিজিবি তাদের গ্রহণ করবে না। কেউ বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দাবি করলে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও পদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারিত চেকপোস্টের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' তিনি বলেন, সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রস্তুত। ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ঈদের সময় অনেক সদস্যের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।
মানবাধিকার ও কূটনৈতিক উদ্বেগ
বাংলাভাষী মানুষজনকে 'অবৈধ অভিবাসী' বা 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে ঘটনার ফ্রিকোয়েন্সি ও ভৌগোলিক বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে নজর কেড়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও সীমান্ত বিশ্লেষকরা বলছেন, নাগরিকত্ব যাচাই না করে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও প্রতিষ্ঠিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। তাদের মতে, এ ধরনের অনুশীলন সীমান্ত এলাকায় মানবিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও চাপ ফেলতে পারে।



