বাজারে এখন সাম্মাম, রক মেলন বা বাঙ্গি—নানা নামে যে হলুদ-কমলা রঙের ফলগুলো দেখা যায়, সেগুলো আসলে খরমুজের বিভিন্ন রূপ। গ্রীষ্মকালীন এই ফলটি শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। সাজেদা ফাউন্ডেশনের পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান বলেন, ‘খরমুজ বা সাম্মাম ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে গরমের সময় শরীরের পানিশূন্যতা রোধ, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।’
পানির অভাব পূরণে খরমুজ
খরমুজে ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ পানি থাকে, যা প্রচণ্ড গরমে শরীরকে পানিশূন্য হতে দেয় না। এতে থাকা প্রচুর পানি ও পটাশিয়াম ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স বজায় রাখতে সাহায্য করে। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া লবণের ঘাটতি পূরণ করে এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও চোখের সুরক্ষা
হলুদ-কমলা রংই বলে দেয়, খরমুজে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ ও বিটা ক্যারোটিন। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এবং চোখের জ্যোতি ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
ভিটামিন ‘সি’র অভাব পূরণ
খরমুজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ থাকে। সাধারণত ভিটামিন ‘সি’ আমাদের শরীরে জমা থাকে না, তাই প্রতিদিন খেতে হয়। খাবারের তালিকায় ধনেপাতা কিংবা কাঁচা মরিচ থাকলে তা থেকে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব রান্না করা হলে সেই ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়। অতিরিক্ত তাপে রান্না করা খাবারের ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়। তাই উত্তম হচ্ছে রান্নার পরিবর্তে তাজা ফলমূল সরাসরি কেটে খাওয়া। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘সি’র ঘাটতি পূরণে খরমুজ বেশ সহায়ক হতে পারে।
হজমশক্তি বাড়ায়
খরমুজে পর্যাপ্ত ফাইবার বা খাদ্য–আঁশ থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এটি হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং পেটের সমস্যা কমায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ সহায়ক
খরমুজে ক্যালরি খুব কম (প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ৩০-৩৫ ক্যালরি), তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এটি সহায়ক। যাঁরা ডায়েট নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে একটি ‘আইডিয়াল স্ন্যাক’।
হার্টের সুস্থতা
উচ্চ পটাশিয়াম থাকায় খরমুজ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে কাজ করে। এটি হৃদপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি ফল।
ত্বকের জন্য ভালো
খরমুজের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের সজীবতা ধরে রাখে এবং অকালবার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। নিয়মিত খেলে ত্বক উজ্জ্বল ও টানটান থাকে।
কাদের জন্য বেশি উপকারী
বাড়ন্ত শিশু ও বয়স্কদের হজমের সমস্যায় খরমুজ দারুণ কাজ করে। যাঁরা ডায়েট নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্ন্যাক। খরমুজের স্বাদ মিষ্টি, তাই এতে সাধারণ কার্বোহাইড্রেট আছে। ফলে ক্লান্তিতে এই ফল খেলে দ্রুত এনার্জি পাওয়া যায় এবং সহজেই ক্লান্তি দূর হয়।
নামবিভ্রাট: সাম্মাম, রক মেলন, নাকি খরমুজ?
বাজারে নামের বিভ্রাট নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। আদতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসবই ‘মাস্কমেলন’ প্রজাতির। মধ্যপ্রাচ্যে যা ‘সাম্মাম’, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে সেটিই ‘রক মেলন’ নামে পরিচিত। আমাদের দেশে এর স্থানীয় একটি বিশেষ জাত হলো বাঙ্গি। জাতভেদে এসবের চামড়া কখনো জালের মতো খসখসে, আবার কখনো একদম মসৃণ হতে পারে। তবে নামের পার্থক্য থাকলেও সব কটিরই উপকারিতা প্রায় একই।
সতর্কতা
ডায়াবেটিস যাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাঁরা পরিমিত পরিমাণে খান। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। যাঁদের ফ্যাটি লিভারজনিত সমস্যা আছে, তাঁদের চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় ফল এড়িয়ে চলা ভালো। যাঁদের হঠাৎ সুগার লেভেল ওঠানামা করে, ঘন ঘন মুড সুইং হয়, রাত জাগার অভ্যাস আছে, তাঁদের মিষ্টিজাতীয় ফল খেলে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। ফলে তাঁদেরও সতর্ক থাকতে হবে।



