পটকা মাছ: ফুটবলের মতো ফোলা এই মাছ বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত কেন?
পটকা মাছ: ফুটবলের মতো ফোলা মাছ বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত কেন?

নদী, নালা, খাল, বিল কিংবা সাগর—সবখানেই এদের দেখা মেলে। জালে ধরা পড়লেই অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটায় এরা। মুহূর্তের মধ্যে মুখ ফুলিয়ে অনেকটা ফুটবলের মতো গোল হয়ে যায় ছোট এই মাছ। যারা একে চেনে না, তারা একে ফুটবল মাছ বলে ডাকে। কিন্তু এই গোলগাল চেহারার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর রূপ। ইংরেজিতে একে বলা হয় পাফারফিশ। আমরা যাকে চিনি পটকা মাছ নামে। কিন্তু কেন বিশ্বের অন্যতম বিষাক্ত প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই মাছ? চলো, এই ছোট্ট মাছের ভয়ংকর সব তথ্য জেনে নিই।

পটকা মাছের পরিচয় ও প্রজাতি

মৎস্যবিজ্ঞানীরা এই মাছের পরিবারকে ডাকেন ‘টেট্রাওডন্টিডি’ (Tetraodontidae) নামে। গ্রিক শব্দ ‘টেট্রা’ মানে চার আর ‘ওডন্ট’ মানে দাঁত। এই মাছের চোয়ালের সামনে চারটি বড় দাঁত থাকে, ওপরে দুটি আর নিচে দুটি। এই চারটি দাঁত একসঙ্গে পাখির শক্ত ঠোঁটের মতো কাজ করে। সমুদ্রের শক্ত খোলসওয়ালা ছোট ছোট প্রাণী বা শামুকজাতীয় শিকারকে কামড়ে গুঁড়া করে ফেলার জন্য এরা এই শক্তিশালী দাঁত ব্যবহার করে।

সারা বিশ্বে এদের প্রায় ২০০টি প্রজাতি রয়েছে। নিজেদের বেলুনের মতো ফুলিয়ে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতার জন্য এদের মজার মজার নামে ডাকা হয়। পাফারফিশ সাধারণত উষ্ণ পানিতে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এদের বেশির ভাগ প্রজাতি সমুদ্রের লোনাপানিতে বাস করলেও কিছু প্রজাতি সামান্য লোনাপানিতেও দেখা যায়। তবে অবাক করা বিষয় হলো, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া আর আফ্রিকার নদীগুলোয় প্রায় ৩০টি প্রজাতির মিঠাপানির পটকা মাছের দেখা মেলে। এদের মধ্যে কঙ্গো পটেটো পাফার এবং ইন্ডিয়ান পি পাফার বেশ পরিচিত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধীরগতির কিন্তু শক্তিশালী প্রতিরক্ষা

অন্য অনেক মাছের তুলনায় পাফারফিশ বেশ ধীরগতিসম্পন্ন। ছোট ছোট পাখনার সাহায্যে এরা পানিতে ভেসে বেড়ায়, যা এদের শিকারি প্রাণীদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করে। কিন্তু তাই বলে এদের শিকার করা সহজ নয়। এদের শরীর ফুলিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আর তীব্র বিষের কারণে সাধারণ কোনো শিকারি এদের ধারেকাছেও ঘেঁষে না। কেবল টাইগার শার্ক, অক্টোপাস বা সামুদ্রিক সাপের মতো কিছু শক্তিশালী ও বিশেষ শিকারিই পাফারফিশকে আক্রমণ করার সাহস দেখায়।

পাফারফিশ কীভাবে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে

পাফারফিশের নিজেকে ফুলিয়ে নেওয়ার পদ্ধতিটি বিজ্ঞানীরা বলেন ‘বুকাল পাম্পিং’। যখনই এরা বিপদ টের পায়, তখনই এদের পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণ পানি কিংবা পানির বাইরে থাকলে বাতাস টেনে নেয়। এদের পাঁজরের হাড় নেই এবং ফুলকার পেশিগুলো বিশেষভাবে তৈরি। তাই এরা খুব সহজেই নিজের স্বাভাবিক আকারের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি ফুলে গিয়ে ফুটবলের মতো গোল হয়ে যেতে পারে।

এই মাছের পাকস্থলীর ত্বক কিন্তু সাধারণ মাছের মতো নয়। এদের ত্বকের কোলাজেন তন্তুগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে। এটি ঠিক একটি ইলাস্টিকের মতো কাজ করে, যা ত্বককে অনেক বেশি প্রসারিত হতে ও পরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে সাহায্য করে।

আগে ধারণা করা হতো ফুলে থাকা অবস্থায় পাফারফিশ শ্বাস নিতে পারে না। তবে নতুন গবেষণা বলছে, এরা ফুলকা ব্যবহার করে শ্বাস নিতে পারলেও এটি এদের জন্য বেশ ক্লান্তিকর। কারণ, স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ফুলে থাকা অবস্থায় এদের পাঁচ গুণ বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একবার শরীর ফোলাতে পাফারফিশের এত বেশি শক্তির অপচয় হয় যে সেই ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে এদের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

ফুলে থাকা অবস্থায় পাফারফিশের পক্ষে সাঁতার কাটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি আরও বাড়ে। তাই শিকারিকে ভয় দেখানোর জন্য এটি একটি দুর্দান্ত কৌশল হলেও বেশিক্ষণ ফুলে থাকা এদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণেই বিপদ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরা দ্রুত পানি বের করে দিয়ে আবার আগের ছোট্ট চেহারায় ফিরে আসে।

পাফারফিশের বিষের ভয়ংকরতা

পাফারফিশকে কেবল এর বলের মতো আকৃতির কারণে গিলে ফেলা কঠিন তা নয়, এদের গায়ে থাকা কাঁটাগুলোও শিকারিদের জন্য বড় বাধা। মাছটি যখন ফুলে ওঠে, তখন এর ত্বকের নিচের লুকানো কাঁটাগুলো শজারুর কাঁটার মতো বাইরে বেরিয়ে আসে। এই কাঁটাগুলো একদিকে যেমন মাছের ত্বককে মজবুত করে, অন্যদিকে শত্রুর মুখে বিঁধে গিয়ে এদের দূরে সরিয়ে রাখে।

পাফারফিশের সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র হলো ‘টেট্রোডোটক্সিন’ বা সংক্ষেপে টিটিএক্স নামের একটি নিউরোটক্সিন। মাছটি নিজে এই বিষ তৈরি করে না। এদের খাওয়া খাবারের সঙ্গে থাকা বিশেষ কিছু ব্যাকটেরিয়া এই বিষ তৈরি করে, যা মাছের দেহে নিষ্ক্রিয়ভাবে জমা থাকে। একটি জিনগত পরিবর্তনের কারণে পাফারফিশের নিজের এই বিষে কোনো ক্ষতি হয় না, কিন্তু এটি অন্যদের জন্য বিষাক্ত। এই বিষ সবচেয়ে বেশি থাকে মাছের যকৃৎ, ডিম্বাশয়, ত্বক আর অন্ত্রে।

পাফারফিশের এই বিষ সায়ানাইডের চেয়েও হাজার গুণের বেশি শক্তিশালী। এটি সরাসরি আমাদের স্নায়ুকোষে আঘাত করে মস্তিষ্ক ও শরীরের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এই বিষক্রিয়ায় শুরুতে মুখ অবশ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিগুলো অকেজো হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে। একটি পাফারফিশে যে পরিমাণ বিষ থাকে, তা দিয়ে অনায়াসেই ৩০ জন মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এই বিষের কোনো প্রতিষেধক বা অ্যান্টিডোট এখনো তৈরি হয়নি।

পটকা মাছ কি খাওয়া যায়?

পাফারফিশের ভয়ংকর বিষের কথা তো আমরা জানলাম। কিন্তু জানলে অবাক হবে, বিপজ্জনক এ মাছই বিশ্বের কিছু দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। মূলত এর স্বাদের চেয়েও এটি খাওয়ার সময় যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, সেটিই ভোজনরসিকদের বেশি টানে। পাফারফিশের মাংস খাওয়ার পর ঠোঁট ও মুখ সামান্য অবশ হয়ে আসা বা ঝিনঝিন করাকে অনেকেই উপভোগ করেন। যদিও এটি আসলে মৃদু বিষক্রিয়ারই প্রাথমিক লক্ষণ।

জাপানে এ মাছ ‘ফুগু’ নামে পরিচিত এবং এটি সেখানে এক রাজকীয় খাবার। বিশেষ করে টাইগার পাফার থেকে তৈরি করা সাশিমি, অর্থাৎ কাঁচা মাছের পাতলা টুকরা জাপানিদের কাছে খুব প্রিয়।

জাপানে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই পাফারফিশ। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৫০ জন এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং দুর্ভাগ্যবশত কয়েকজনের মৃত্যুও হয়। তবে মজার বিষয় হলো, রেস্তোরাঁয় খেয়ে কেউ মারা যাওয়ার ঘটনা খুব বিরল। যাঁরা মৎস্যশিকারি বা শৌখিন রাঁধুনি ও সঠিক নিয়ম না মেনে নিজেরাই বাড়িতে এই মাছ রান্না করেন, তাঁরাই মূলত বিপদে পড়েন।

আগের তুলনায় এখন পাফারফিশের বিষক্রিয়া অনেক কমে এসেছে। জাপান সরকার এখন সমুদ্র উপকূলের ১৮টি ভোজ্য পাফারফিশের তালিকা তৈরি করে দিয়েছে। মাছের কোন অংশগুলো নিরাপদ আর কোনগুলো বিষাক্ত, তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। বর্তমানে জাপানে পাফারফিশ রান্না করতে হলে শেফ বা বাবুর্চিদের বিশেষ লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। প্রশিক্ষণ ছাড়া সেখানে কেউ এই মাছ স্পর্শ করার অনুমতি পান না।

পাফারফিশ খাওয়ার এই রোমাঞ্চ কিন্তু নতুন নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক বর্জ্যের স্তূপে পাফারফিশের অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছেন। এর মানে হলো, প্রাচীনকালের মানুষেরাও এই মাছের বিষ সম্পর্কে জানতেন।

সেন্ট মার্টিনের সমুদ্রসৈকতে প্রায়ই কাঁটাওয়ালা পটকা মাছ দেখা যায়। এ ছাড়া নদীতেও এদের দেখা মেলে। দেখতে অদ্ভুত আর ফুটবলের মতো গোল বলে অনেকে শখের বশে এগুলো ধরে। কিন্তু এই মাছের গায়ে ও শরীরের ভেতরে মারাত্মক বিষ থাকে। তাই সমুদ্রসৈকতে বা জেলের জালে এই মাছ দেখলে কখনোই খালি হাতে ধরা উচিত নয়। সামান্য অসাবধানতায় এই বিষ শরীরে ঢুকে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।