টিকা: শতাব্দী প্রাচীন আবিষ্কার যা বদলে দিয়েছে মানবজীবন
টিকা: শতাব্দী প্রাচীন আবিষ্কার ও মানবজীবনে এর প্রভাব

টিকার ইতিহাস: প্রাচীন চর্চা থেকে আধুনিক বিজ্ঞান

শত শত বছর ধরে মানুষ মারাত্মক সব রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় খুঁজেছে। ইতিহাসের অন্য অনেক আবিষ্কারের চেয়ে টিকা মানুষের জীবন রক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। টিকা নিয়ে বিগত এক সহস্রাব্দের অসাধারণ কিছু আবিষ্কার ও অর্জন আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে।

ভ্যারিওলেশন: প্রথম ধাপ

অন্তত ১৫০০ শতাব্দী থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সুস্থ মানুষদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুটিবসন্তের সংস্পর্শে এনে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করা হতো। একে বলা হতো ভ্যারিওলেশন। কিছু সূত্রমতে এ চর্চা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ বছর আগেও প্রচলিত ছিল। ১৭২১ সালে লেডি মেরি ওয়োর্টলি মন্টাগু তুরস্কে গুটিবসন্ত প্রতিরোধের এ পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করেন এবং এটিকে ইউরোপে পরিচিত করান। তিনি তাঁর দুই মেয়ের ওপর এ পদ্ধতি প্রয়োগের অনুরোধ জানান।

এডওয়ার্ড জেনার ও গুটিবসন্তের টিকা

১৭৭৪ সালে বেঞ্জামিন জেস্টি একটি যুগান্তকারী ধারণা পরীক্ষা করেন। তিনি লক্ষ করেন যে কাউপক্স বা গো-বসন্তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা গুটিবসন্ত থেকে সুরক্ষিত থাকেন। ১৭৯৬ সালের মে মাসে ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার এ ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি একজন গোয়ালিনীর হাতের গো-বসন্তের ক্ষত থেকে উপাদান নিয়ে ৮ বছর বয়সী বালক জেমস ফিপসের ওপর প্রয়োগ করেন। ফিপস কয়েক দিন অসুস্থ থাকলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। ১৭৯৬ সালের জুলাই মাসে জেনার ফিপসকে সরাসরি মানুষের গুটিবসন্তের ক্ষত থেকে উপাদান দিয়ে পরীক্ষা করেন। ফিপস সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে এবং পৃথিবীর ইতিহাসে গুটিবসন্তের টিকার প্রথম সফল গ্রহীতা হিসেবে নাম লেখায়। ‘ভ্যাকসিন’ শব্দটি লাতিন শব্দ ‘ভ্যাকা’ বা ‘গরু’ থেকে এসেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লুই পাস্তুর ও ল্যাবরেটরিতে টিকা

১৮৭২ সালে লুই পাস্তুর প্রথম ল্যাবরেটরিতে টিকা তৈরি করেন। এটি ছিল মুরগির কলেরার বিরুদ্ধে কার্যকর। এ সময় পাস্তুর স্ট্রোক এবং তাঁর দুই মেয়ের টাইফয়েডে মৃত্যুর শোক কাটিয়ে গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। ১৮৮৫ সালে পাস্তুর জলাতঙ্ক প্রতিরোধে বড় সাফল্য পান। জোসেফ মেস্টার নামের এক বালকের ওপর তিনি ১৩টি ইনজেকশন প্রয়োগ করেন। পাস্তুর পেশায় চিকিৎসক ছিলেন না এবং মানুষের শরীরে প্যাথোজেন প্রবেশ করানো তখন ছিল প্রচণ্ড বিতর্কিত ও অনিশ্চিত একটি বিষয়। মেস্টার সুস্থ হয়ে ওঠে। বড় হয়ে মেস্টার প্যারিসে পাস্তুরের সমাধির তত্ত্বাবধায়ক হন।

বিংশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ টিকা

১৮৯৪ সালে বিজ্ঞানী আন্না ওয়েসেলস উইলিয়ামস ডিপথেরিয়ার একটি ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন আলাদা করতে সক্ষম হন। তখন এই রোগের অ্যান্টিটক্সিন তৈরির পথ খুলে যায়। ১৯১৮-১৯ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে বিশ্বজুড়ে ২ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। এর ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। পরে ১৯৩৭ সালে ইয়োলো ফিভারের টিকা উদ্ভাবন করেন ম্যাক্স থেইলার ও হিউ স্মিথ। ১৯৩৯ সালে হুপিং কাশির টিকা আবিষ্কার করেন পার্ল কেনড্রিক ও গ্রেস এলডারিং। ১৯৪৫ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন থমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র ও জোনাস সাল্ক। ১৯৫২ সালে পোলিও ভ্যাকসিনের প্রথম কার্যকর সংস্করণ আবিষ্কার করেন জোনাস সাল্ক। ১৯৫৪ সালে সাল্ক তাঁর তৈরি টিকার ট্রায়াল শুরু করেন ১৩ লক্ষাধিক শিশুর ওপর। ১৯৬০ সালে আলবার্ট সাবিন পোলিও টিকার দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরি করেন, যা ছিল মুখে খাওয়ার বা ওরাল ভ্যাকসিন। চেকোস্লোভাকিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পোলিও নির্মূলের ঘোষণা দেয়।

গুটিবসন্ত নির্মূল ও অন্যান্য সাফল্য

১৯৬৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুটিবসন্ত নির্মূল করার জন্য একটি নিবিড় কর্মসূচি ঘোষণা করে। মজার বিষয় হলো, শীতল যুদ্ধের সময়ও এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন একাত্ম হয়ে কাজ করেছিল। ১৯৬৯ সালে বারুচ ব্লুমবার্গ ও আর্ভিং মিলম্যান হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করেন। ১৯৭১ সালে মরিস হিলম্যান হাম, মাম্পস ও রুবেলাকে একত্র করে এমএমআর টিকা তৈরি করেন। ১৯৮০ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীকে গুটিবসন্তমুক্ত ঘোষণা করে। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজয়। ১৯৮৮ সালে পোলিও নির্মূল করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। সে সময় ১২৫টি দেশে পোলিও ছিল নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। ১৯৯৪ সালে আমেরিকা এবং ২০০২ সালে ইউরোপ পোলিওমুক্ত হয়।

একবিংশ শতাব্দীর টিকা

২০০০ সালে নতুন শতাব্দীর শুরুতে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়। অ্যান স্যারেউস্কির নেতৃত্বে গবেষণার ফলে ২০০৬ সালে প্রথম এইচপিভি ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়। ২০১৬ সালে মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন প্রকল্পের সাফল্য সাব-সাহারা আফ্রিকার অনেক দেশে মেনিনজাইটিস নির্মূল করে। ২০১৯ সালে ঘানা, মালাউই ও কেনিয়ায় ম্যালেরিয়ার প্রথম টিকা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে চালু হয়। এটি শিশুদের মৃত্যু হ্রাসে বিশেষ কার্যকর। ২০২০–২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির আবির্ভাব ঘটে। ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে এমআরএনএ প্রযুক্তির সাহায্যে টিকা তৈরি ও বিতরণ করা হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রথম ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

বিগত দুই শতাব্দী টিকার জয়জয়কার থাকলেও চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। গত ৩০ বছরে টিকার কারণে শিশুমৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। তবু বর্তমানে ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ৫ শিশুর মধ্যে ১ শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।