আটলান্টিকের মাঝসমুদ্রে একটি ক্রুজ জাহাজে ভ্রমণের স্বাভাবিক ছন্দের মধ্যেই হঠাৎ একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারও জ্বর, কারও পেটের সমস্যা, তারপর দ্রুত শ্বাসকষ্ট। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারান তিনজন।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ২ মে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির খবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়। ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু থাকা জাহাজটিতে ৪ মে পর্যন্ত সাতজন আক্রান্ত হয়—এর মধ্যে দুজনের শরীরে ল্যাবরেটরিতে হান্টাভাইরাস নিশ্চিত করা হয়েছে, বাকিরা সন্দেহভাজন। একজন গুরুতর অসুস্থ, তিনজনের উপসর্গ তুলনামূলক হালকা।
উপসর্গের বিবর্তন
৬ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে শুরু হওয়া এসব অসুস্থতায় প্রথমে জ্বর ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা দেখা দিলেও দ্রুত তা নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং শকে রূপ নেয়।
তদন্ত ও ব্যবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ঘটনাটির তদন্ত এখনও চলছে। আক্রান্তদের আলাদা রাখা, চিকিৎসা, জরুরি সরিয়ে নেওয়া এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে।
হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ পদ্ধতি
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষের শরীরে এটি প্রবেশ করে শ্বাসের সঙ্গে। ইঁদুরের শুকনো মল, মূত্র বা লালা বাতাসে মিশে গেলে তা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। কখনও কামড় বা আঁচড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে বলে জানিয়েছে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। অর্থাৎ, চোখে দেখা যায় না—কিন্তু বাতাসেই ভেসে বেড়াতে পারে এই ভাইরাস।
শুরুটা সাধারণ, শেষটা মারাত্মক
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে লক্ষণগুলো খুব সাধারণ—জ্বর, ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা। অনেকেই এটিকে মৌসুমি অসুখ ভেবে ভুল করতে পারেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তা দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম নামে পরিচিত এই অবস্থায় মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
আরেকটি রূপ: কিডনিতে আঘাত
হান্টাভাইরাসের আরেকটি ধরন শরীরের কিডনিকে আক্রমণ করে। এতে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, এমনকি কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, এটি শুধু শ্বাসতন্ত্রের রোগ নয়—পুরো শরীরকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
বিরল, কিন্তু ঝুঁকি বড়
বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাস খুব বেশি ছড়ায় না। প্রতি বছর আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ এর একটি ধরনে আক্রান্ত হন, যার বেশিরভাগই ইউরোপ ও এশিয়ায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল হলেও এটি অবহেলা করার মতো নয়। কারণ সংক্রমণ হলে দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
চিকিৎসা নেই, ভরসা সহায়ক চিকিৎসা
হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। রোগীকে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়—অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন, এমনকি কিডনি সমস্যায় ডায়ালাইসিস পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। গুরুতর রোগীদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়।
প্রতিরোধই প্রধান উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। বাড়ির ফাঁকফোকর বন্ধ রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা জরুরি।
নতুন করে সতর্কবার্তা
সাম্প্রতিক এই ক্রুজ-ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—সব ভাইরাস চোখে দেখা যায় না, আর সব ঝুঁকিও আগে থেকে বোঝা যায় না। হান্টাভাইরাস হয়তো খুব পরিচিত নাম নয়, কিন্তু সুযোগ পেলে এটি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে—সেই ক্রুজ জাহাজ এখন তারই নীরব সাক্ষী।



