ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি: বিশেষজ্ঞ
ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি

বিশ্বায়নের এই যুগে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কালে কেবল নির্দিষ্ট দুটি ভাষায় দখল থাকাই যথেষ্ট নয়। ইংরেজি ভাষা এখন আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। সুতরাং, এখন আর শুধু মাতৃভাষা বাংলা জানলেই হয় না, ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য হয়ে উঠছে। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কালে কেবল এ দুটি ভাষায় দখল থাকাই যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য মান্দারিন, ফ্রেঞ্চ কিংবা স্প্যানিশের মতো তৃতীয় কোনো আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার প্রয়োজনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

দ্বিভাষিক গণ্ডি যখন যথেষ্ট নয়

একজন শিক্ষার্থী যখন বাংলা ও ইংরেজির বাইরে অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে শেখে, তখন তার চিন্তার জগৎ সাধারণের চেয়ে আলাদা হয়ে যায়। কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এলেন বিয়ালিস্টকের দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, বহুভাষী শিশুদের মস্তিষ্কে এক্সিকিউটিভ ফাংশন অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। এটি তাদের মনোযোগ ধরে রাখা, অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়া এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত দক্ষতা বাড়ায় না, একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলে। বহুমাত্রিক ভাষার জ্ঞান শিশুর মস্তিষ্কের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে এবং তাকে বৃহৎ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বকে দেখতে শেখায়।

তৃতীয় একটি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন ও প্রভাব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, ভাষাশিক্ষা এখন শুধু সৃজনশীল দক্ষতা নয়, এটি রীতিমতো ক্যারিয়ারের সুযোগ ও পেশাগত সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে এখনো কোনো পেশায় যুক্ত হননি, তাঁদের ক্ষেত্রে তৃতীয় ভাষার দক্ষতা অনেকখানি এগিয়ে রাখে। জাতিসংঘ, বিদেশি সংস্থা, এনজিও ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রায়ই তৃতীয় ভাষার দক্ষতা কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান হয়। আবার ভাষাদক্ষতার বিভিন্ন স্তর আছে। ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থেকে উচ্চতর জ্ঞানে উন্নীত হতে পারলে বিভিন্ন ধরনের অনুবাদের কাজে কিংবা ভাষা প্রশিক্ষণের কাজে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখা যায়। ভাষাদক্ষতা চূড়ান্তভাবে বৈশ্বিকভাবে রাষ্ট্র ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অধ্যাপক তারিক মনজুর আরও বলেন, ‘নতুন একটি ভাষা শেখা মানে কেবল কিছু ব্যাকরণ বা শব্দ মুখস্থ করা নয়, বরং একটি নতুন সত্তাকে ধারণ করা। এটি একজন মানুষের সহানুভূতি এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখন আমরা অন্য কোনো জাতির ভাষায় কথা বলি, তখন আমরা তাদের আবেগ ও মূল্যবোধকে ভেতর থেকে অনুভব করতে পারি। এই ভাষাগত সংযোগই একজন শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে উদার ও মানবিক করে তোলে। মনস্তাত্ত্বিক এই রূপান্তর তাঁকে পরবর্তী জীবনে যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে এবং বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে সাহস জোগায়।’

মাতৃভাষা বনাম নতুন ভাষা

অনেকের মনে সংশয় থাকে যে তৃতীয় ভাষা শিখলে মাতৃভাষা বাংলার চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না। এ বিষয়ে অধ্যাপক তারিক মনজুর আশ্বস্ত করে প্রথম আলোকে জানান, মাতৃভাষার দক্ষতা কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। অনেক দেশে শিশুরা বহুভাষিক পরিবেশে বড় হয়ে সহজাতভাবেই একাধিক ভাষা শেখে। তিনি মনে করিয়ে দেন, মাতৃভাষায় শোনা ও বলার দক্ষতা প্রাকৃতিক হলেও পড়া ও লেখার দক্ষতা অর্জনে আলাদা পরিশ্রম লাগে। তাই ভাষার চর্চা বজায় রাখলে সব ভাষার সঙ্গেই ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব। ক্যারিয়ারের সুযোগ ও সম্ভাবনা বাড়ানোর স্বার্থেই মাতৃভাষার পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য সময় দিতে হবে।

উচ্চশিক্ষা ও আগামীর ক্যারিয়ার

আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় ক্ষেত্রেই কথোপকথন বা যোগাযোগের প্রধান ভাষা ইংরেজি। তবে বিশাল পৃথিবীর বৃহৎ অংশের দাপ্তরিক বা ব্যবহারিক ভাষা ইংরেজি নয়। তা ছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি বা চীনের মতো দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চাইলে সেসব দেশের ভাষা শিখে নেওয়াই ভালো। তাতে স্কলারশিপসহ নানা রকম সুযোগও বাড়ে। আবার একজন শিক্ষার্থী যখন ইংরেজির পাশাপাশি অন্য একটি আন্তর্জাতিক ভাষা আয়ত্ত করেন, তখন তাঁর জন্য ইউরোপ বা এশিয়ার বিশাল শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়ে যায়। বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে এখন এমন কর্মী খোঁজা হয়, যাঁরা একাধিক ভাষায় পারদর্শী।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও আগামীর পথ

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন বিদেশি ভাষার প্রাথমিক ও উচ্চতর কোর্স চালু রয়েছে। তবে অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, ‘বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের গতানুগতিক পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। কেবল স্নাতক ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তারা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারে।’ ভাষা একটি সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি। ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের সাহিত্য ও জীবনাচরণের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়। ইংরেজি মাধ্যমের প্রচলিত সিলেবাসের বাইরে এমন ভাষাগত বৈচিত্র্য শিশুকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে বলে মনে করেন গবেষকেরা।