একসঙ্গে জন্ম নেওয়া তিন বোনের এসএসসি পরীক্ষায় স্বপ্নীল, স্বর্ণালী ও সেঁজুতির যাত্রা
ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর গ্রামের একই দিনে জন্ম নেওয়া তিন বোন— স্বপ্নীল বর্মণ, স্বর্ণালী বর্মণ ও সেঁজুতি বর্মণ। ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভূমিষ্ঠ হওয়া এই তিন বোন এখন তাদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা এসএসসির মুখোমুখি। মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষায় তারা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিচ্ছে, যা তাদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
একই ছায়ায় বেড়ে ওঠা তিন বোন
বাবা ঠান্ডারাম বর্মণ ও মা ময়না রানী সেনের ঘর আলো করে আসা এই তিন বোন ছোটবেলা থেকেই একে অপরের ছায়া হয়ে আছে। স্থানীয় আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে তারা ভর্তি হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তারা বেশ পরিচিত মুখ, যদিও ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাদের আলাদা করতে অনেক সময় খোদ শিক্ষকদেরই হিমশিম খেতে হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান জানান, "ওদের চেহারায় এতটাই মিল যে মাঝেমধ্যে আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করে তাদের শনাক্ত করতে হতো। তবে পড়াশোনায় তারা তিনজনই অত্যন্ত মেধাবী।" এই মিলের কারণে প্রায়ই তাদের শনাক্ত করতে সমস্যা হয়, কিন্তু একাডেমিক দক্ষতায় তারা সকলের নজর কেড়েছে।
স্বপ্ন ও লক্ষ্যের ভিন্নতা
বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হলেও তাদের ভালো লাগার জায়গাগুলো কিছুটা ভিন্ন। স্বপ্নীল বর্মণের প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান হলেও মন পড়ে থাকে বাংলা সাহিত্যে। ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশসেবা করতে চায় সে। স্বর্ণালী বর্মণের ভালো লাগে জীববিজ্ঞান ও রসায়ন। স্বপ্ন দেখছে সাদা অ্যাপ্রোন জড়িয়ে চিকিৎসক হওয়ার। সেঁজুতি বর্মণেরও প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান, তবে সে মানুষ গড়ার কারিগর অর্থাৎ শিক্ষক হতে আগ্রহী।
পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতিতেও পিছিয়ে নেই এই তিন বোন। তারা তিনজনই বেতারের ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী। দেশাত্মবোধক গান গাইতে এবং সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস পড়তে তারা দারুণ ভালোবাসে। খাবারের তালিকায় তিনজনেরই সাধারণ পছন্দ বিরিয়ানি, যা তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরেকটি নিদর্শন।
পারিবারিক সমর্থন ও সংগ্রাম
তিন কন্যাসন্তানের একসঙ্গে লালন-পালন করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, সেই স্মৃতি রোমন্থন করে মা ময়না রানী সেন বলেন, "কষ্ট যেমন ছিল, আনন্দও ছিল অনেক। তারা ঝগড়া করে ঠিকই, কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।" বাবা ঠান্ডারাম বর্মণ গর্ব করে বলেন, "শুরুতে যখন জেনেছিলাম তিনটি সন্তান হবে, কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম; কিন্তু আজ ওদের বড় হতে দেখে সব কষ্ট ভুলে গেছি। আমার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে ওদের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।"
পরীক্ষার শেষ মুহূর্তে পড়ার টেবিলে এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এই তিন বোন। তাদের একটাই লক্ষ্য— ভালো ফলাফল করে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো এবং আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ায় অংশ নেওয়া। এই যাত্রায় তাদের একতা ও দৃঢ় প্রত্যয় পরিবার ও সমাজের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হয়ে উঠছে।



