হাম থেকে সেরে ওঠার পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছে দেড় বছরের শিশু তাইবা। শুক্রবার (৫ জুন) সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তার বাবার নাম জাহিদুল ইসলাম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল তাইবা।
কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহীতে ছুটে আসা
তাইবার উন্নত চিকিৎসার আশায় কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহীতে ছুটে এসেছিলেন কৃষক জাহিদুল ইসলাম। বুকভরা আশা ছিল, মেয়েটি সুস্থ হয়ে আবার তার কোলে ফিরবে। কিন্তু সব চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর নির্মম পরিণতি ঠেকাতে পারেনি। হামের সঙ্গে লড়াইয়ের পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছোট্ট তাইবার মৃত্যু হয়। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার আমলা চৌধুরীপাড়া গ্রামে।
হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পর আবার অসুস্থ
পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত মাসের শুরুতে জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত হলে তাইবাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে চিকিৎসকেরা হাম শনাক্ত করেন। প্রায় ১২ দিনের চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। তখন পরিবারে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি।
গত ২৭ মে আবারও জ্বর ও কাশি শুরু হলে তাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২৯ মে রাতে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ডেঙ্গু শনাক্ত ও আইসিইউতে চিকিৎসা
রামেক হাসপাতালে ভর্তি করার পরদিনই তার অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ৩১ মে রক্ত পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, চলতি মৌসুমে রামেক হাসপাতালে শনাক্ত হওয়া প্রথম ডেঙ্গু রোগী ছিল সে।
ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর আইসিইউতে তার নিবিড় চিকিৎসা চলতে থাকে। কয়েকদিন পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে গত বুধবার (৩ জুন) তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। এতে পরিবারের মধ্যে নতুন করে আশা জাগে। কিন্তু সেই আশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওয়ার্ডে নেওয়ার পর আবার জ্বরসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। দ্রুত অবস্থার অবনতি হলে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পুনরায় তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর আর তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বাবার বেদনাভরা কথা
মেয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন বাবা জাহিদুল ইসলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একমাত্র মেয়েকে বাঁচাতে যা কিছু করার দরকার ছিল, সব করেছি। উন্নত চিকিৎসার আশায় কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহীতে এনেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বাঁচাতে পারলাম না।’
তিনি আরও জানান, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচানোর জন্য তিনি ও তার পরিবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহে রাতভর বিভিন্ন জায়গায় ছুটতে হয়েছে। শিশুটির রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ হওয়ায় বাবা-মায়ের কারও রক্তের সঙ্গে মিল না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এক চাচার রক্ত দেওয়া হলেও তা তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
রক্ত সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তাইবার জন্য নির্দিষ্ট রক্ত দ্রুত সংগ্রহ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সংরক্ষিত রক্ত ব্যবহার না করে তাৎক্ষণিকভাবে দাতার কাছ থেকে রক্ত নিতে হতো। এরপর সেই গরম রক্ত তাইবাকে দিতে হতো।
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ
জাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বৃহস্পতিবার রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েনি। তার দাবি, ভুল চিকিৎসার কারণেই তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য
রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পর শিশুটির শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা অনেক বেশি এবং প্লাটিলেট কম পাওয়া যায়। পরে ডেঙ্গু পরীক্ষায় পজিটিভ আসে এবং চিকিৎসা শুরু করা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষায় ফল নেগেটিভও আসে। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় অক্সিজেনের প্রয়োজন না থাকায় তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে সেখানে গিয়ে কেন আবার অবস্থার অবনতি হলো, তা স্পষ্ট নয়। পরে দ্রুত তাকে পুনরায় আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, চলতি মৌসুমে হাসপাতালে প্রথম ডেঙ্গু রোগী ছিল তাইবা। বর্তমানে দু-একজন করে রোগী আসছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়লে তাদের জন্য আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালুর প্রস্তুতি রয়েছে।



