রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জীবদ্দশায় তার সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হলেও শেষ সময়ে তিনি নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার মধ্যে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উচ্চপদস্থ সন্তান, কিন্তু অবহেলিত মা
জানা গেছে, নূর জাহান বেগমের এক ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং তার মেয়ে একটি স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এমন একটি পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তার অযত্ন ও একাকী মৃত্যুর ঘটনা সমাজে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই প্রবীণ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের বিষয়টি সামনে এনেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও আলোচনায় এসেছে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন এবং এর কার্যকর প্রয়োগের প্রশ্ন।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এই আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তাহার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিতে হইবে। কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকিলে সেইক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করিয়া তাহাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিবে।
- প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করিতে হইবে।
- কোন সন্তান তাহার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করিতে বাধ্য করিবে না।
- প্রত্যেক সন্তান তাহার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখিবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করিবে।
পৃথক বসবাসের ক্ষেত্রে করণীয়
পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তান হইতে পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের সহিত সাক্ষাত করিতে হইবে। কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সহিত বসবাস না করিয়া পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাহার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করিবে।
দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণপোষণ
এমনকি পিতা-মাতার দাদা-দাদী, অবর্তমানে নানা-নানীর ভরণ-পোষণের কথাও বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ধারা (৩) এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকিবে এবং এই ভরণ পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসাবে গণ্য হইবে।
শাস্তির বিধান
শাস্তির বিধানে কী আছে? কোন সন্তান ভরণ-পোষণের ধারা ও উপ-ধারার কোনো বিধান লংঘন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে; বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে। অথবা কোন সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমত, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকট আত্নীয় ব্যক্তি- পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করিলে; বা পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করিলে- তিনি উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করিয়াছে গণ্যে উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। এই আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য হবে বলেও বলা হয়েছে।



