মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও বিস্ময়কর কাঠামো হলো ওয়ার্মহোল। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের মতোই ওয়ার্মহোলেও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অত্যন্ত প্রবল, যা স্থান-কালের গঠনকে বাঁকিয়ে দেয়। তবে পার্থক্য হলো, ওয়ার্মহোল মহাবিশ্বের দুটি ভিন্ন বিন্দুকে সংযুক্ত করতে একটি সরাসরি সুড়ঙ্গ তৈরি করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, স্থান ও কালের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের উপযোগী একটি গোপন সুড়ঙ্গ আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে।
ওয়ার্মহোলের তাত্ত্বিক ভিত্তি
এত দিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ওয়ার্মহোল তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি তৈরি হওয়ামাত্রই ধসে পড়বে। তবে একদল পদার্থবিজ্ঞানী এখন দাবি করছেন, মহাবিশ্বের রহস্যময় বস্তু ডার্ক ম্যাটার ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পারে এবং একে দীর্ঘক্ষণ খোলা রাখতেও সাহায্য করতে পারে। যদি এই তত্ত্ব সঠিক হয়, তবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে যাওয়ার এক বিশাল প্রবেশপথ লুকিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
ভারতের জিএলএ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী সাইবাল রায় ওয়ার্মহোলকে একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ওয়ার্মহোল হলো এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যাওয়ার একটি পথ। এটি অনেকটা দুটি ম্যানহোল কভারের মধ্যবর্তী সুড়ঙ্গের মতো। একটি প্রবেশপথ এবং অন্যটি বহির্গমন পথ হিসেবে কাজ করে। তাত্ত্বিকভাবে, ওয়ার্মহোলের এক পাশে যা প্রবেশ করবে, তা মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসবে। যদি এই সুড়ঙ্গ যথেষ্ট প্রশস্ত ও স্থিতিশীল হয়, তবে মানুষ বা মহাকাশযানও এর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।
ডার্ক ম্যাটারের ভূমিকা
ডার্ক ম্যাটার একটি অদৃশ্য পদার্থ, যা মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ গঠন করে। এটি আলো প্রতিফলিত করে না বলে সরাসরি দেখা যায় না, তবে এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব দেখে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। অধিকাংশ তত্ত্ব অনুযায়ী ডার্ক ম্যাটার মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে সবকিছুকে কাছে টানে। বিজ্ঞানী সাইবাল রায় জানিয়েছেন, ডার্ক ম্যাটারের অনন্য ঘনত্ব এবং চরম পরিবেশে এর আচরণ স্পেসটাইমের নকশা বদলে দিতে পারে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে ডার্ক ম্যাটারের বলয় রয়েছে, তা একটি ওয়ার্মহোল তৈরি এবং এর মুখ খোলা রাখতে সক্ষম। তাত্ত্বিকভাবে দেখা গেছে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অংশে একটি ওয়ার্মহোল বিদ্যমান।
ওয়ার্মহোলের আকার
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা এই ওয়ার্মহোল প্রায় ৩২ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর কসমোলজিস্ট ডেজান স্টোজকোভিচ মনে করেন, এই গবেষণার যুক্তি বেশ জোরালো। প্রকৃতি সব সময়ই বৈধ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী কিছু না কিছু তৈরির পথ খুঁজে নেয়। তাই প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ওয়ার্মহোল হয়তো আগে থেকেই অস্তিত্বশীল এবং আমরা কোনো একদিন এর সুবিধা নিতে পারব।
বিরোধী মতামত
সব বিজ্ঞানী অবশ্য নতুন এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। লিভারপুল জন মুরেজ ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী আন্দ্রিয়া ফন্ট এই তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ডার্ক ম্যাটার যে এক্সোটিক ম্যাটার হিসেবে কাজ করতে পারে, তার কোনো প্রমাণ নেই। ৩২ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ প্রশস্ত একটি ওয়ার্মহোল খোলা রাখতে যে পরিমাণ নেগেটিভ এনার্জি প্রয়োজন, তা পুরো গ্যালাক্সির শক্তির চেয়েও ১ লাখ গুণ বেশি। সহজ কথায়, এমন একটি সুড়ঙ্গ টিকিয়ে রাখতে হাজার হাজার গ্যালাক্সির শক্তির সমান শক্তি প্রয়োজন। নতুন তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তবে আমরা হয়তো আমাদের জীবদ্দশাতেই অন্য গ্যালাক্সিতে যাওয়ার আশা করতে পারি।



