ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ ইভানজেলিস্তা টরিসেলির (১৬০৮-১৬৪৭ খ্রি.) পরীক্ষার কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু এই পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনেকেরই অজানা। শুরুতে একটি কল্পিত গল্প বলি। টরিসেলি প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন। ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না, খেতে পারছিলেন না। একদম মুমূর্ষু অবস্থা। তিনি নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন—‘প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু পরীক্ষাটা আমি যতবার করেছি, ততবারই শূন্যস্থান দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? তাহলে আমাদের ভাবনা কি ভুল! আমরা যেভাবে ভাবছি, প্রকৃতি সেভাবে কাজ করছে না!’ ডাক্তার তাঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে কিছুদিন পর টরিসেলি সুস্থ হয়ে উঠলেন। যে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় দুশ্চিন্তায় ছিলেন, সুস্থ হয়ে তিনি আবার সেই পরীক্ষাই করলেন। কিন্তু ফলাফল একই! টরিসেলি বুঝতে পারলেন, তিনি কোনো বিপ্লবী নিয়ম আবিষ্কার করেছেন। তবে তখনো তিনি জানতেন না, কেন প্রকৃতি এমন আচরণ করে। তিনি শুধু এতটুকুই বুঝেছেন, প্রকৃতিকে আমরা যেভাবে দেখছি, সে সেভাবে কাজ করে না। সেভাবেই যদি কাজ করত, তাহলে টিউবের ওপরে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকত না।
টরিসেলির পরীক্ষার পদ্ধতি
টরিসেলি এই পরীক্ষাটি করেন ১৬৪৩ সালে। এই পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই সে সময় বেশি চাঞ্চল্যকর ছিল। টরিসেলির পরীক্ষার সিস্টেম ছিল খুব চমৎকার। এখন একটু ভাবি, একটা গ্লাসে পানি নিয়ে যদি গ্লাসটা উল্টো করি, তাহলে কী হবে? অবশ্যই পানি মাটিতে পড়ে যাবে। এবার চিন্তা করুন, আমার হাতে একটা পারদভর্তি টেস্টটিউব আছে। আমি যদি এটি উল্টো করি, অবশ্যই পারদ নিচে পড়ে যাবে। আমি এখন এই কাজটা আরেকটু বুদ্ধি খাঁটিয়ে করব। এবার পারদভর্তি টেস্টটিউবটি অন্য একটি পারদভর্তি মগ বা পাত্রের ওপর উল্টো করে চেপে ধরি। এমনভাবে চেপে ধরেছি, যাতে টেস্টটিউব থেকে কোনো পারদ পড়ে না যায় অথবা কোনো বাতাস ভেতরে ঢুকতে না পারে। এটাই ছিল টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টের সিস্টেম। টরিসেলি ১০০ সেন্টিমিটারের একটি পারদভর্তি টেস্টটিউব অন্য একটি পারদভর্তি পাত্রে লম্বভাবে চেপে ধরেছিলেন।
পরীক্ষার ফলাফল ও শূন্যস্থান
এখন পরীক্ষার ফল কী হবে? অবশ্যই টেস্টটিউবের পারদগুলো পাত্রের পারদের সঙ্গে মিশে গিয়ে টেস্টটিউব খালি হয়ে যাবে! কিন্তু বাস্তবে এমন হয় না। বাস্তবে টেস্টটিউবের ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ফাঁকা থাকে। বাকি ৭৬ সেন্টিমিটার পারদ টেস্টটিউবেই থেকে যায়! আমাদের সাধারণ জ্ঞান তো বলে, সবটুকু পারদ মিশে গিয়ে টেস্টটিউব খালি হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানে সামান্য কিছু পারদই মিশতে পারে। এই প্রশ্নটাই ভাবিয়েছিল টরিসেলিকে। তৎকালীন দার্শনিকেরা মনে করতেন, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, প্রকৃতিতে শূন্যস্থান থাকতে পারে, যা হলো টেস্টটিউবের ওপরের ২৪ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা। আর এ জন্যই এই এক্সপেরিমেন্টটা এত বেশি বিখ্যাত। ওই ২৪ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গাকে বলা হয় টরিসেলির শূন্যস্থান। টরিসেলির এই পরীক্ষা এতই চমৎকার যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যারোমিটারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এই লেখাটার মূল উদ্দেশ্য হলো, টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টের সাহায্যে বাতাসের চাপ বের করা।
প্যাসকেলের ব্যাখ্যা: চাপ ও প্রবাহী
ফরাসি গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী ব্লেইজ প্যাসকেলের (১৬২৩-১৬৬২ খ্রি.) ব্যাখ্যাটা ছিল প্রবাহীর মধ্যে চাপের প্রভাব নিয়ে। প্রথমে বুঝতে হবে চাপ কী এবং প্রবাহী কী। চাপ মানে হলো প্রতি একক ক্ষেত্রফলে বল প্রয়োগের পরিমাণ। একটা ৪ বর্গমিটার টেবিলের ওপর আমি ১২ নিউটন বলে ঘুষি দিলাম। এখন ওই টেবিলের প্রতি ১ বর্গমিটারে কতটুকু বল প্রয়োগ হবে? ৪ বর্গমিটারে বল প্রয়োগ হয় ১২ নিউটন, ১ বর্গমিটারে বল প্রয়োগ হয় ৩ নিউটন। আমরা একটু আগেই দেখেছি, প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যতটুকু বল প্রয়োগ করা হয়, তা-ই চাপ। তাই টেবিলে চাপ হবে ৩ প্যাসকেল। আসলে একটি সমীকরণ কেমন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে সংজ্ঞার ওপর। এখন এই জিনিসটারই বীজগাণিতিক রূপ দেখি। যদি টেবিলের ক্ষেত্রফল হয় A বর্গমিটার এবং বল প্রয়োগ করা হয় F পরিমাণ, তাহলে চাপ হবে P = F ÷ A।
প্রবাহীর সংজ্ঞা
এখন জানব, প্রবাহী কী। আমরা জানি, তরল একটি প্রবাহী। এখন চিন্তা করুন, আপনার কাছে এক গ্লাস পানি আছে। পানিতে তো অনেকগুলো স্তর থাকে। যেসব পদার্থের একটি স্তরের সাপেক্ষে আরেকটির আপেক্ষিক বেগ থাকে, তাদের প্রবাহী বলে। এ জন্যই পানি একটি প্রবাহী। একটি স্তরের সাপেক্ষে আরেকটির আপেক্ষিক বেগ মানে একটার সাপেক্ষে আরেকটা গতিশীল। যেমন রাস্তায় চলা একটি রিকশা ও সিএনজির কথা ভাবুন। রাস্তায় যখন রিকশা ও সিএনজি চলে, তখন রিকশার তুলনায় সিএনজি দ্রুত এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, রিকশার সাপেক্ষে সিএনজি গতিশীল।
প্যাসকেলের নীতি
এখন আসি প্যাসকেলের ব্যাখ্যায়। প্রবাহী, অর্থাৎ তরল ও বায়বীয় পদার্থে চাপ দেওয়া নিয়ে প্যাসকেল বলেন—‘একটি আবদ্ধ পাত্রে তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে বাইরে থেকে চাপ দেওয়া হলে, সেটি সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং পাত্রের গায়ে চাপটা লম্বভাবে কাজ করবে।’ খুবই সাদামাটা একটি বাক্য, কিন্তু এর মাঝে লুকিয়ে আছে হাইড্রোলিক প্রেসের মতো সুন্দর ভাবনাগুলো। এই বাক্যটা বোঝার জন্য একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। একটি কাচের গ্লাসে পানি নিয়ে পানির ওপরের পৃষ্ঠে পিস্টন দিয়ে চাপ দিলে কী হবে? দেখুন, চাপ দেওয়ার আগে পানির অণুগুলো একটি সাম্যাবস্থায় ছিল। যখন ওপর থেকে চাপ দেওয়া শুরু হবে, তখন ওপরের পানিগুলো অতিরিক্ত একটি বল অনুভব করবে। কারণ, চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল, বা প্রতি ১ বর্গমিটার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হওয়া বল। এই অতিরিক্ত বলের কারণে অণুগুলোর সাম্যাবস্থা নষ্ট হবে। তখন তারা আবার সাম্যাবস্থায় যেতে চাইবে। তাই ওই অণুগুলো তাদের চারপাশের অণুগুলোতে বল প্রয়োগ করবে। এভাবে সমানভাবে চাপ সঞ্চালিত হয় বা ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে চাপ দিতে থাকলে এই চাপ ছড়াতে থাকবে এবং একসময় গ্লাসের গায়ে লেগে থাকা কণাগুলোকে চাপ প্রয়োগ করবে। তখন গ্লাসের গায়ের অণুগুলো লম্বভাবে গ্লাসে চাপ দেবে। আর একসময় গ্লাস সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়বে। এই অভিজ্ঞতার কথাটাই প্যাসকেল বলেছেন বৈজ্ঞানিকভাবে!
টরিসেলির পরীক্ষায় প্যাসকেলের নীতির প্রয়োগ
এখন আবার আসি টরিসেলির পরীক্ষায়। এ পরীক্ষায় আমরা দেখেছি, সেখানে মাত্র ২৪ সেন্টিমিটার পারদ অন্য পারদের সঙ্গে মিশতে পারে, কিন্তু ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পারদ মিশতে পারে না। কিন্তু কেন? তার উত্তর লুকিয়ে আছে প্যাসকেলের ব্যাখ্যায়। আপনারা জানেন, পারদ একটি তরল পদার্থ। তাই পারদে চাপ দিলে সেই চাপ সমানভাবে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পাত্রের দেয়ালে লম্বালম্বিভাবে আঘাত করে। কিন্তু পারদকে চাপ দেবে কে? টরিসেলির পরীক্ষায় তো তিনি পারদকে কোনো পিস্টন দিয়ে চাপ দেননি, তাহলে চাপ আসবে কোথা থেকে? চাপ আসে বায়ুমণ্ডল থেকে। আমাদের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের কণা ছড়িয়ে আছে। তারা বিভিন্ন বেগে আমাদের আশপাশে ছোটাছুটি করছে। ফলে তারা পারদের পাত্রে বল প্রয়োগ করতে পারে। আমরা যেহেতু জানি, চাপ হলো বল প্রয়োগের পরিমাণ। তাই পারদ একটি চাপ অনুভব করবে। এটি আসলে বলের সূত্র (F = ma) থেকেও দেখা যায়। যেহেতু বাতাসের কণার ভর ও ত্বরণ আছে, তাই এটি বল প্রয়োগ করতে পারে। আর এই বলের কারণেই ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পারদকে জাগিয়ে রাখতে পারে।
কেন আমরা বায়ুচাপ অনুভব করি না?
কিন্তু সেটি কীভাবে হয়? এই চাপ আমরা অনুভব করি না কেন? প্রথম প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া যাবে টরিসেলির পরীক্ষার সিস্টেমে। টরিসেলির পরীক্ষায় বড় আকারের পাত্রে বাতাস ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। ফলে এই চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় পাত্রে বাতাসের চাপ ছড়াতে ছড়াতে একসময় টেস্টটিউবের প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে সেই চাপটাই পারদকে জাগিয়ে রাখে। যার কারণে ২৪ সেন্টিমিটার পারদ বড় পাত্রে মিশতে পারে। এখন কথা হলো, বাতাস কেন ৭৬ সেন্টিমিটার পারদকে জাগিয়ে রাখে? এটি বুঝতে হলে তরল পদার্থের ধর্ম বুঝতে হবে। আরেকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো দেওয়া হয়নি, বাতাসের চাপ কেন আমরা অনুভব করি না? কারণ আমাদের হৃৎপিণ্ড পাম্প করার মাধ্যমে রক্ত প্রতিনিয়ত আমাদের ত্বকে চাপ দিচ্ছে। একদিকে বাতাসের চাপ, অন্যদিকে রক্তের চাপ—দুটি ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই এই বায়ুচাপ আমরা অনুভব করি না।
ঘনত্বের ধারণা
আমরা সাধারণত কঠিন পদার্থের পরিমাণ জানার জন্য ভর মাপি। কিন্তু প্রবাহী, অর্থাৎ তরল বা বায়বীয় পদার্থে এটি মাপা একটু কঠিন। কারণ, তরল বা বায়বীয় পদার্থকে যে পাত্রে রাখা হয়, তারা সেই পাত্রেরই আকার ধারণ করে। যেমন গ্যাসের কথাই চিন্তা করা যাক। গ্যাসকে যে পাত্রে রাখা হয়, সে ওই পাত্রের সম্পূর্ণ আকার জুড়ে থাকে। এ জন্য গ্যাস বেশি নাকি কম, তা মাপার জন্য ঘনত্ব অনেক বেশি কার্যকর। ঘনত্বের কারণে দুটি প্রবাহীকে খুব সহজে আলাদা করা যায়। শুধু তা-ই নয়, প্রবাহী ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্ম দেখায়।
ঘনত্বের সূত্র
এখন একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করি। আমার কাছে দুটি সিলিন্ডার আছে। একটি ১ ঘনমিটারের, অন্যটি ৩.৩৭৫ ঘনমিটারের। এখন আমি দুটি সিলিন্ডারেই ১ কেজি করে নাইট্রোজেন ঢোকালাম। প্রশ্ন হলো, দুটি নাইট্রোজেনভর্তি সিলিন্ডারে আমি যদি ১০ গ্রামের একটি কাগজ এমনভাবে ফেলি, যাতে বাইরে থেকে নতুন কোনো গ্যাস ঢুকতে না পারে, তাহলে কোন সিলিন্ডারে কাগজ বেশি বাধা অনুভব করবে? অবশ্যই ১ ঘনমিটারের সিলিন্ডারে। কারণ, সেখানে সিলিন্ডারের জায়গা কম। তাই নাইট্রোজেন গাদাগাদি করে অবস্থান করবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় সিলিন্ডারে জায়গা বেশি, তাই নাইট্রোজেনের অণুগুলো প্রথমটার তুলনায় কম গাদাগাদি করে অবস্থান করবে। এ কারণে প্রথম সিলিন্ডারে বাধা বেশি পাবে, অনেকটা ট্রাফিক জ্যামের মতো! এই পার্থক্যের কারণ কী? এর কারণ ঘনত্ব। এখন আসি, ঘনত্ব কী। ঘনত্ব হলো একক আয়তনে (১ ঘনমিটার) কতটুকু ভর থাকবে তার পরিমাপ। ওপরের উদাহরণ দেখি। সেখানে প্রথম পাত্রের আয়তন ১ ঘনমিটার। যেহেতু ১ ঘনমিটারে যতটুকু পদার্থ থাকতে পারে, তাই প্রথম সিলিন্ডারে ঘনত্ব হবে ১ কেজি প্রতি ঘনমিটার। দ্বিতীয় পাত্রের আয়তন ৩.৩৭৫ ঘনমিটার। তাই প্রতি ১ ঘনমিটারে ভর বা পদার্থের পরিমাণ হবে (১ ÷ ৩.৩৭৫) = ০.২৯৬ কেজি প্রতি ঘনমিটার। এটিকে বীজগাণিতিক আকারে লেখা যায়: V আয়তনে প্রবাহীর ভর = m; ১ একক আয়তনে প্রবাহীর ভর = m ÷ V। আর এ জন্যই ঘনত্ব, ρ (রো) = m ÷ V। এটাই ঘনত্বের সূত্র।
তরলের চাপ ও উচ্চতা
আমরা ঘনত্বের আলাপ শুরু করেছিলাম টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টে কেন ৭৬ সেন্টিমিটার পারদকে বায়ুমণ্ডল জাগিয়ে রাখে, তা জানার জন্য। এখন আমরা আস্তে আস্তে সেদিকে এগোব। তার আগে প্রশ্ন, একটি পাত্রে পানি বা তরল পদার্থ নিলে সে ওই পাত্রে কী পরিমাণ চাপ দেবে? আমরা দেখেছি, চাপ P = F ÷ A। কোনো পাত্রে ২ কেজি পানি নিলে এবং তার ক্ষেত্রফল 0.4 m² হলে আমরা চাপ বের করতে পারি। পানি যে বল প্রয়োগ করবে, তা হলো F = mg, যা পানির ওজন। এখানে m হলো পানির ভর (2 kg) আর g মহাকর্ষীয় ত্বরণ (9.8)। তাই F = 19.6 N। এবার চাপ হলো: P = F ÷ A = 19.6 ÷ 0.4 = 49 Pa।
চাপের সূত্র P = hρg
আচ্ছা এবার দেখুন, পাত্রের তলায় তো পানি F = mg বল দিচ্ছে। আবার আমরা দেখেছি m = ρV, তাই লিখতে পারি: F = mg = ρVg। এখানে V হলো আয়তন। আমরা জানি, আয়তন = ক্ষেত্রফল × উচ্চতা। V = Ah, F = Ahρg। এবার এটি চাপের সূত্রে বসাই: P = F ÷ A, P = (Ahρg) ÷ A, P = hρg। এবার দেখি P = hρg সূত্রটি কতটুকু কার্যকর। ধরুন, একটি সুষম পাত্রের ওপরে ও তলার ক্ষেত্রফল একই। কিন্তু একটি কোণকের ফ্রাস্টামে ওপরের আর তলার ক্ষেত্রফল একই নয়। এ জন্য সুষম পাত্রে পানি বল প্রয়োগ করবে Ahρg পরিমাণ। কারণ, এতে h সংখ্যক A আছে। A মানে প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল। সুষম পাত্রকে ভূমির সমান্তরালে কাটলে সব সময় একই ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে, যা হলো A। সুতরাং চাপ, P = (Ahρg) ÷ A = hρg। কিন্তু যেহেতু ফ্রাস্টামের পাত্র সুষম নয়, তাই এর আয়তন V-কে Ah বলা যাবে না। কারণ এতে h সংখ্যক A নেই বা প্রতিবার ভূমির সমান্তরালে কাটলে একই ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে না। ফলে এর চাপ হবে, P = (Vρg) ÷ A, অর্থাৎ এখানে আমরা V-কে ভেঙে Ah লিখতে পারিনি।
টরিসেলির পরীক্ষায় বায়ুচাপের মান
এবার টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টে আবার ফিরি। টরিসেলির পরীক্ষায় একটি পারদভর্তি পাত্রে আরেকটি পারদভর্তি টেস্টটিউব লম্বভাবে বসানো হয়। আর বাতাসের চাপের কারণে সেটি ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঠে থাকে। এই চাপকে 1 atm বা বাতাসের স্বাভাবিক চাপ বলা হয়। এখন আমরা দেখব 1 atm সমান কত প্যাসকেল। টরিসেলি যে পাত্র ব্যবহার করেছিলেন, সেটি ছিল সুষম। তাই এর চাপ P = hρg (এখানে ঘনত্ব হবে পারদের ঘনত্ব)। মান বসিয়ে, P = 0.76 × 13600 × 9.8 = 101292.8 প্যাসকেল। 1 atm = 1.012 × 10⁵ pascal (প্যাসকেল)। এখন তো আমরা পেয়ে গেলাম, বাতাস কত প্যাসকেল চাপ দেয়। এখান থেকে বুঝতে পারব এই চাপ কতটুকু পারদকে জাগিয়ে রাখতে পারবে। বাতাস তো পাত্রে সব সময় চাপ দিচ্ছে। যখন টেস্টটিউব পাত্রে ডোবানো হয়, তখন পারদ একটি ছিদ্র পেয়ে যায়। ফলে পারদ ওই ছিদ্রে প্রবেশ করে। প্রবেশের পর কতটুকু উচ্চতা পর্যন্ত পারদ ওপরে উঠবে, তা সূত্র থেকে দেখা যায়: P = hρg => h = P ÷ ρg। যেহেতু আমরা একটু আগেই বাতাসের চাপ কত প্যাসকেল, সেটা মেপেছি; এখন সেই মান বসালে আমরা পাব ০.৭৬ মিটার বা ৭৬ সেমি। টরিসেলির এই পরীক্ষা এত দারুণ যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যারোমিটারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। আমরা চাইলে পারদস্তম্ভের ওঠানামা দেখে বাতাসের চাপ মেপে ফেলতে পারব খুব সহজেই।
কেন পারদ ব্যবহার করা হয়?
এখন শেষ একটি প্রশ্ন, টরিসেলি কেন পারদ ব্যবহার করলেন? এর উত্তর পাব আরেকটি প্রশ্ন থেকে। টরিসেলির পরীক্ষায় পারদের পরিবর্তে পানি ব্যবহার করলে কী হতো? পারদের জায়গায় পানি ব্যবহার করলে পরীক্ষাটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নলটি হতে হবে ১১ মি. বা ১১০০ সেমি লম্বা। বাকি সব একই থাকবে। যেহেতু চাপ 1 atm, তাই P = hρg => h = P ÷ ρg = 101292.8 ÷ (1000 × 9.8) = 10.336 m। যেখানে পানি ওঠে ১০.৩৩৬ মিটার, সেখানে পারদ ওঠে ০.৭৬ মিটার। আমরা যদি নলটা ১১ মিটার না নিয়ে ১৩ মিটারও নিতাম, পানি ১০.৩৩৬ মিটার পর্যন্তই উঠত। পানি ১০.৩৩৬ মিটার আর পারদ ০.৭৬ মিটার ওঠে কেন? কারণ, একই বায়ুমণ্ডলীয় চাপে: h ∝ 1/ρ। পদার্থের ঘনত্ব যত কম হবে, বস্তু তত ওপরে উঠবে। আবার পদার্থের ঘনত্ব যত বেশি হবে, বস্তু তত কম ওপরে উঠবে। কারণ, ঘনত্ব বাড়া মানে ভর বাড়া বা ভারী হওয়া। টরিসেলি পারদ নিয়েছিলেন, কারণ পারদ ভারী তরল। যদি পাতলা তরল (যেমন পানি) নিতেন, তাহলে ল্যাবে ১১ মিটার লম্বা টেস্টটিউব আনতে হতো! যা অনেক কষ্টকর ও ব্যয়বহুল।
টরিসেলি এই অদ্ভুত সুন্দর পরীক্ষাটি করে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এর ব্যাখ্যা পরে দিয়েছেন প্যাসকেল! এখন কী মনে হয়—‘আমরা প্রকৃতিকে যেভাবে দেখি, সে ওইভাবেই কাজ করে, নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল?’



