জুলাই আন্দোলনের দেড় বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসু নির্বাচনের আলোচিত ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব তার রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে এনেছেন। সোমবার বিকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের প্যাডে প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক পদে তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি বিজ্ঞপ্তি পোস্ট করার পরপরই ক্যাম্পাসে শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।
রাকসু নির্বাচনে প্যানেল ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক তিন সমন্বয়কের নেতৃত্বে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ১৮টিতে প্রার্থী দেয় প্যানেলটি। প্যানেলে সহসভাপতি (ভিপি) পদে সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী সজীব, জিএস পদে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালাহউদ্দিন আম্মার এবং এজিএস পদে আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আকিল বিন তালেবের নাম ঘোষণা করা হয়।
ওই সময় প্যানেলে ঘোষিত কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতা আছে—এমন অভিযোগ ওঠে। প্যানেলটি ছাত্রশিবিরের ‘বি টিম’ বা ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে গঠন করা হয়েছে বলেও ক্যাম্পাসে গুঞ্জন ছড়ায়। তবে তখন ভিপি ও জিএস প্রার্থী এসব অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন।
নির্বাচনী প্রচার ও পরবর্তী ঘটনা
পরে এজিএস প্রার্থী আকিল বিন তালেব, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক ফাহির আমিন এবং সহকারী মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রার্থী এম শামিম প্যানেল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে ভোটে জিএস পদে নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আম্মার। এদিকে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালেও প্রচারে নীরব ছিলেন ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব। আলোচিত ভিপি প্রার্থীদের মধ্যে মেহেদী অন্যতম হলেও ভোটের মাঠে সক্রিয় হননি।
অভিযোগ ওঠে, শিবির-সমর্থিত ভিপি প্রার্থীকে সুবিধা দিতেই তিনি সক্রিয় হননি। তবে এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেন সজীব। তিনি দাবি করেছিলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রচারে অংশ নিতে পারেননি। ভিপি পদের নির্বাচনে তিনি মাত্র ৩২৩ ভোট পান, যা নির্বাচনী ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়
মেহেদী সজীবের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নোমান ইমতিয়াজ তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নতুন পদের জন্য শুভকামনা। পাশাপাশি সকলের ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করার জন্য ধন্যবাদ।’
সাইফুর রহমান নামের এক সাবেক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে তীব্র ভাষায় মন্তব্য করেন, ‘হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে বেঈমানী করে আত্মপ্রকাশ করেছে ছোট ভাই মেহেদী সজীব। আরও কিছু ছোট ভাই আছে। একে একে সবাই সামনে আসবে।’ এই পোস্টগুলো দ্রুত ভাইরাল হয়ে শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি করে।
মেহেদী সজীবের ব্যাখ্যা ও যুক্তি
এতদিন পর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে নিয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে মেহেদী সজীব বলেন, ‘আমি অনেক আগে থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের আদর্শিক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম। জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আন্দোলন সমন্বয় করেছি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য তখন পরিচয় প্রকাশ করিনি। পরে অনূকূল পরিবেশ না থাকায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছি। পটপরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাই প্রকাশ্যে আনলাম।’
তার এই ব্যাখ্যা ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দাবিকে জোরালো করে, আবার অনেকে এটিকে পূর্বের অবস্থানের সঙ্গে বৈপরীত্য হিসেবে দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি, তবে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।



