নওগাঁয় জমি বিরোধে নিকটাত্মীয়ের পরিকল্পনায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যা, তিনজন গ্রেফতার
নওগাঁয় জমি বিরোধে নিকটাত্মীয়ের হাতে চারজন নিহত, তিনজন গ্রেফতার

নওগাঁয় জমি বিরোধের জেরে নিকটাত্মীয়ের হাতে চারজন নিহত

নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নিকটাত্মীয়ের পরিকল্পনায় একই পরিবারের চারজনকে নির্মমভাবে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকালে জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

গ্রেফতারকৃত ও নিহতদের পরিচয়

গ্রেফতারকৃতরা হলেন নিহত হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৩০), তার ছেলে শাহিন হোসেন এবং হাবিবুরের আরেক বোনের ছেলে সবুজ রানা (২০)। তাদের বাড়ি উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে। পুলিশ তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো হাসুয়া ও ছুরি উদ্ধার করেছে।

সোমবার মধ্যরাতে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (৩০), ছেলে পারভেজ রহমান (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৩) গলাকেটে হত্যার শিকার হন। ঘটনার পর পুলিশ হাবিবুরের ভাগনে সবুজ রানা, তার বাবা নমির উদ্দিন, দুই বোন ডালিমা বেগম ও হালিমা বেগমসহ ছয়-সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জমি বিরোধই মূল কারণ

পুলিশ শুরু থেকেই চার হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমিজমার বিরোধকে দায়ী করছে। ঘরের দেয়ালে ‘খুনিদের’ লেখা একটি বার্তা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। বার্তায় লেখা ছিল, ‘নমির তুই বেঁচে গেলি, দলিল দে। এবার তোর পালা।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। হাবিবুরের বাবা তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি মেয়েদের লিখে দেন। হাবিবুরকে বেশি সম্পত্তি দেওয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সঙ্গে তার ঝামেলা শুরু হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।’

হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

পুলিশ সুপার বলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন এবং হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। সোমবার বিকালে হাবিবুর তার ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে উপজেলার ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে যান। তিনি এক লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন, কিন্তু গরু না কিনেই বাড়ি ফিরে আসেন।

বাড়ি ফিরে আসার পর গ্রামের একটি মাঠে সবুজ রানা, শহিদুল, শাহিনসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয়জন পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার রাত ৮টার দিকে হাবিবুরের বাড়িতে যান সবুজ। তিনি তার মামা-মামি ও মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে খাবার খান। ওই সময় সবার অগোচরে ভাগনে শাহিন বাড়িতে প্রবেশ করে একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সবুজ খাবার খেয়ে বের হয়ে যান।

বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন মূল দরজা খুলে দেন। তখন সবুজ রানা, শহিদুলসহ খুনিরা পাঁচজন বাড়িতে প্রবেশ করেন। তারা প্রথমে হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দেন। এরপর হাবিবুরের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করেন।

স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। হাবিবুরকে হত্যা করার সময় পপি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন। বাড়ির আঙিনায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পপির মাথায় হাসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়েন। পরে তাকেও গলা কেটে হত্যা করা হয়। হাবিবুরের পুরো পরিবারকে নির্বংশ করার উদ্দেশে তার দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

গ্রেফতার ও তদন্তের অগ্রগতি

সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবুরের বাড়িতে আসেন। তখন তাদের কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, রাতে গ্রামের একটি খড়ের গাদায় লুকানো হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়া উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘খুনিরা মনে করেছে, হাবিবুরকে নির্বংশ করলে পরবর্তীতে তার নামে থাকা সম্পত্তির ভাগিদার হবে। এই ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) জেলার ওসি হাসিবুল্লাহ হাবিব, নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান।

এ ঘটনায় নিহত পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়ামতপুর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। বিক্ষুব্ধ জনতা সবুজের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার বলেন, ‘থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কেউ যেন নিরপরাধ কোনো মানুষকে কষ্ট না দিতে না পারে। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।’