বাকেরগঞ্জ পৌরসভায় উন্নয়ন কাজে ব্যয় নিয়ে বিতর্ক
বরিশালের বাকেরগঞ্জ পৌরসভায় ছয়টি প্যাকেজে উন্নয়ন কাজের দরপত্রে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে সড়কের পাশে মাত্র ১০টি বেঞ্চ স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ১৭ হাজার ২২৭ টাকা, যা প্রতিটি বেঞ্চের জন্য প্রায় ৪১ হাজার ৭২৩ টাকা। স্থানীয়রা এই ব্যয়কে কাজের ধরন ও পরিসরের তুলনায় অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।
দরপত্রের বিস্তারিত ব্যয় বিশ্লেষণ
২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় আহ্বানকৃত এই দরপত্রে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ ৭ হাজার ৬৬৭ টাকা। দরপত্র বিক্রয়ের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ এপ্রিল ২০২৬। ব্যয়ের বড় অংশই পৌরসভা ভবন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী:
- ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পৌরসভা ক্যাম্পাসে ইউনিব্লক সড়ক ও প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে ব্যয়: ৯ লাখ ৪০ হাজার ১৫২ টাকা
- একই ভবনের কনফারেন্স ও অফিস কক্ষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যয়: ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮৮ টাকা
- ভবনের ছাদে টাইলস বসাতে বরাদ্দ: ১১ লাখ ৪৯ হাজার ১২১ টাকা
এই তিনটি কাজ মিলিয়ে পৌর ভবনকেন্দ্রিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৪ লাখ ২৬ হাজার ৬১ টাকা। এছাড়া পৌরসভার ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০টি সড়ক বাতি স্থাপনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি বাতিতে ব্যয় প্রায় ৫১ হাজার ৭৯২ টাকা। বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের জন্য একটি অপেক্ষাকক্ষ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৩ টাকা।
স্থানীয় নেতা ও কর্মচারীর প্রতিক্রিয়া
সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা আলিম জোমাদ্দার এসব ব্যয়কে অযৌক্তিক দাবি করে বলেন, "পৌর ভবনের জন্য নেওয়া বেশিরভাগ কাজই অপ্রয়োজনীয়। ভবনের সড়ক ভালো অবস্থায় রয়েছে, ছাদে টাইলস বসানোরও প্রয়োজন নেই। মাত্র ৩শ বর্গফুটের দুটি কক্ষ সাজাতে ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা অস্বাভাবিক।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী জানান, প্রশাসক (ইউএনও) ও প্রকৌশলীর বদলির প্রেক্ষাপটে এটি তাদের শেষ সময়ের কাজ হওয়ায় ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে।
পৌর বিএনপির ৪ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি জামাল হোসেন বিপ্লব বলেন, "পৌর ভবনে বড় ধরনের কোনো কাজের প্রয়োজন নেই। সেখানে ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ অস্বাভাবিক এবং বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।"
ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
পৌর ঠিকাদার জাকির হোসেন দাবি করেন, দরপত্রে নির্ধারিত ব্যয় ও বাস্তব কাজের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি বলেন, "১ হাজার ৫০০ বর্গফুট ছাদে টাইলস বসাতে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা লাগতে পারে, অথচ এখানে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।"
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দীন বলেন, "প্রাক্কলন অনুযায়ী বাজারদর বিবেচনা করেই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রাক্কলন না দেখে আমি নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারছি না।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রোমানা আফরোজ বলেন, "বিষয়টি আমার কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তবে কাজের বরাদ্দ ও প্রাক্কলন নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের।"
সচেতন নাগরিকদের উদ্বেগ
সচেতন নাগরিকদের মতে, ছোট পরিসরের কাজেও অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোয় প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা দরপত্র প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ধরনের অস্বাভাবিক ব্যয় নির্ধারণ স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বাকেরগঞ্জ পৌরসভার এই দরপত্র প্রক্রিয়া এখন স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকের মতে, উন্নয়ন কাজের নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ অন্তর্ভুক্ত করা স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস করতে পারে।



