এলজিইডিতে আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগ স্থগিত, দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্ক
এলজিইডিতে আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগ স্থগিত, দুর্নীতি বিতর্ক

এলজিইডিতে আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগ স্থগিত, দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্ক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন মো. আব্দুর রশীদ মিয়া। এবার এক বছরের চুক্তিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। তবে শুক্রবার (২৭ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে নিয়োগের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। আগামী রবিবার এ নিয়ে নতুন করে আদেশ জারি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্তের প্রেক্ষাপট

আব্দুর রশীদ মিয়ার এই নিয়োগ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৩ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তার স্ত্রী ফাতিমা যাকিয়াহ ও আত্মীয়দের নামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় আব্দুর রশীদ মিয়ার নামে একাধিক সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৭০ কোটি টাকা। এছাড়া, এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ লেনদেনের অভিযোগও তদন্তাধীন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিয়োগের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রভাব

আব্দুর রশীদ মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি চলতি দায়িত্বে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি অবসরে যান। বর্তমান বিএনপি সরকার এসে তাকে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। তবে, এই নিয়োগ কেন্দ্র করে বড় ধরনের লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এলজিইডির এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্নমতের প্রকৌশলীরা সবসময়ই বঞ্চিত ছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে তাদের ডাম্পিং পোস্ট দেওয়া হতো।’ আরেক প্রকৌশলী মন্তব্য করেন, ‘আব্দুর রশীদ মিয়া আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী। অন্তর্বর্তী সরকারও তাকে পুরস্কার দিয়েছে। আর বিএনপি সরকার এসে অবসর ভাঙিয়ে আবার তাকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে বসালো।’

প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো। যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবে, এটা অগ্রহণযোগ্য।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এলজিইডি এমনিতেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’

এলজিইডির সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী বিতর্কিত এই কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয় পুনঃবিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, রশীদ মিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে এ ধরনের নিয়োগ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহিদুল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, আব্দুর রশীদ মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি, ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনা এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিমুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।