সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়ম: ১০ কেজির বদলে মাত্র ৫ কেজি পাচ্ছেন দরিদ্ররা
শ্যামনগরে ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়ম, ১০ কেজির বদলে ৫ কেজি

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ভিজিএফ চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নে সরকারি ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারকে ১০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে মাত্র ৪.৫ থেকে ৫ কেজি চাল বিতরণ করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।

চাল বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সরেজমিন চিত্র

সোমবার (১৬ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত নিয়ম না মেনে ডিজিটাল স্কেলের পরিবর্তে প্লাস্টিকের বালতিতে করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। কয়েকটি প্যাকেট চাল ডিজিটাল স্কেলে মেপে দেখা গেছে, কোনো প্যাকেটে ৪.৮৫০ কেজি, কোনোটি ৫.৩০০ কেজি এবং সর্বোচ্চ ৫.৮০০ কেজি চাল রয়েছে, যা সরকারি বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম।

ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে ঈদ পূর্ববর্তী ভোগান্তি

ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী জানান, ১০ কেজির স্থলে তাঁদের দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৪ থেকে ৫ কেজি চাল, যা ঈদের আগে তাঁদের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন নারী বলেন, "আমরা দরিদ্র পরিবার, সরকারি সহায়তার উপর নির্ভর করি। এভাবে চাল কম দেওয়া হলে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়।"

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি বরাদ্দ ও বাস্তবতার পার্থক্য

শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ১৩,৩৩৭টি পরিবারের জন্য ১৩৩.৩৭০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি পৌরসভার ১,৫৪৯টি পরিবারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫.৪৯০ টন চাল। এর মধ্যে আটুলিয়া ইউনিয়নের ১,৩৭৩টি পরিবারের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩.৭৩০ টন। তবে বাস্তবে বরাদ্দ অনুযায়ী চাল বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও জবাবদিহিতা

চাল বিতরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ কর্মকর্তা উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার শাহাদাৎ হোসেনের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাঁকে সেখানে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই সময় তিনি জেলা কার্যালয়ে বৈঠকে ছিলেন। অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আটুলিয়া ইউনিয়ন ভিজিএফ কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান বলেন, "তালিকা প্রণয়ন থেকে চাল বিতরণ পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম ইউনিয়ন পরিষদই পরিচালনা করেছে, আমরা শুধু তদারকির দায়িত্বে ছিলাম।"

ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কার্ত্তিক চন্দ্র মণ্ডল দাবি করেন, চাল কম দেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত চাল ওয়ার্ডভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের উপস্থিতিতেই বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।

ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের স্বীকারোক্তি

ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন ৫ কেজি করে চাল বিতরণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "কার্ডধারীর বাইরেও অতিরিক্ত লোক সমাগম হওয়ায় সবাইকে ভাগ করে দেওয়ার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।"

ইউপি চেয়ারম্যান আবু সালেহ জানান, তার অনুপস্থিতিতে চাল বিতরণ হয়েছে। অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতির কারণে বাইরে কোথাও চাল ভাগ করা হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাস

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিরাজ হোসেন খান বলেন, "নিয়ম অনুযায়ী চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" একই আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক।

এই ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে, এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে স্থানীয় অধিবাসীরা।