একদিকে উচ্ছেদ অভিযান, অন্যদিকে আবারও সড়ক-ফুটপাতে ফিরে আসা রাজধানীর হকারদের এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। দুই সিটি করপোরেশন ও পুলিশের উদ্যোগে কিছুদিন পরপর উচ্ছেদ করা হলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। হকারদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব জায়গায় ব্যবসা করে আসছেন; হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তাদের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই তারা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসেন।
ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘হকার কার্ড' দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে ডিএনসিসি মিরপুর ১০, মিরপুর ১ ও মিরপুর ২ এলাকার ২০২ জন হকারকে এবং ডিএসসিসি প্রায় ১০০ জনকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়েছে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আরও হকারকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে পরিস্থিতি
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে—উচ্ছেদ অভিযানের পরপরই গুলিস্তান, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, সায়েদাবাদ, ধোলাইখাল, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, নিউ মার্কেট, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হকাররা আবারও ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে নিয়েছেন। কোথাও কোথাও তারা ভ্যানগাড়ি ও অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দোকান চালু করেছেন। এতে এসব এলাকার যান চলাচলে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে এবং পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গুলিস্তান, মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি আগের মতোই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফুটপাথের পাশাপাশি সড়কের বড় অংশ দখল করে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে, যার ফলে যানজট ও জনদুর্ভোগ আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নৈশ মার্কেটের পরিকল্পনা
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ফুটপাত হকারমুক্ত রাখতে রাজধানীতে আটটি নৈশ মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, হঠাৎ উচ্ছেদ কার্যকর সমাধান নয়। তাই সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের বসার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যাতে দিনের বেলায় ফুটপাত ও সড়ক যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা জানান ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
চিহ্নিত এলাকাসমূহ
ডিএসসিসি এলাকায় প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত এলাকাগুলো হলো—গুলিস্তানের রমনা ভবনের লিংক রোডে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ-সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা), মতিঝিল ইসলাম চেম্বারের সামনে ও আশপাশের এলাকায় সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা)। রাজউক ভবনের পেছনে: দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, বাইতুল মোকাররম পূর্ব গেটসংলগ্ন লিংক রোড, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠসংলগ্ন রাস্তা, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট।
ডিজিটাল কার্ডের সুবিধা
ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ১০০ হকারকে কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যককে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া, ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, ‘হকার বসার পরও ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম পাঁচ-ছয় ফুট জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।'
প্রশাসকের বক্তব্য
ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা শহরে হকার ব্যবস্থাপনা শুরু করেছি। এর ফলে একদিকে যেমন নিরাপদ ও পথচারীবান্ধব ফুটপাত নিশ্চিতকরণ ও সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন সম্ভব হবে, অন্যদিকে হকার নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হবে।' তিনি বলেন, 'হকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।' পুনর্বাসনের পর সরকার ও সিটি করপোরেশনের বিধিবিধান মেনে এবং বরাদ্দ জায়গার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে বৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি হকারদের প্রতি আহ্বান জানান।
ডিএনসিসির উদ্যোগ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে হকারদের বিকল্প স্থানে স্থানান্তর করা হবে। এ পর্যন্ত ২০২ জন হকারের মধ্যে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজারসংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত মোট হকারের সংখ্যা ৮২৯ জন।
হকার্স ইউনিয়নের দাবি
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াৎ বলেন, আগে এক দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এলোমেলোভাবে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এবার উচ্ছেদের পর নতুন বন্দোবস্ত চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।' তিনি জানান, হকারদের জন্য তারা ১০ দফা দাবি সরকারের কাছে দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে হকারদের জন্য আইন করা, তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া এবং ফুটপাতের তিন ভাগের এক ভাগে হকারদের বসতে দেওয়া। যতদিন পর্যন্ত হকারদের জন্য আইন না হবে, ততদিন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে না।



