গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার: বিএনপির শপথ না নেওয়ায় উদ্বেগ
গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার: বিএনপির শপথ নয়

গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার: বিএনপির শপথ না নেওয়ায় উদ্বেগ

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে একনায়কতান্ত্রিক ও কঠোর নিয়ন্ত্রণবাদী চরিত্রের কারণে এবং গণহারে জনগণকে হত্যার মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক অধিকার ও বৈধতা হারিয়ে ফেলা হয়েছিল। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১ এবং ১১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও গণপ্রজাতন্ত্রী চরিত্র ধ্বংস করা হয়েছিল। দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত সংবিধান সরকারপ্রধান ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং জনগণ সার্বভৌমত্বের মালিক হওয়ায় তাদের ওপরই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভার এসে পড়ে।

অন্তর্বর্তী সরকার ও জনগণের সার্বভৌম কর্তৃত্ব

রাজনৈতিক চিন্তায় এটা প্রতিষ্ঠিত যে নাগরিকেরা তাদের আস্থা ও বিশ্বাস ভঙ্গকারী সরকারকে পরিবর্তন বা উৎখাত করার ক্ষমতা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় এই ধারণার উল্লেখ রয়েছে। ২০২৪-২৬-এর অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের লিখিত সংবিধানের বাইরে জনগণের সার্বভৌম কর্তৃত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল, যা তাকে গণতন্ত্র, গণপ্রজাতন্ত্র এবং নাগরিকদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের অনন্য ক্ষমতা দিয়েছিল। জুলাই জাতীয় সনদ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ সেই ক্ষমতাবলেই গৃহীত হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করলেও সেই প্রতিনিধিত্বের পরিধি ও সীমা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন ছিল। ফলে জুলাই সনদ ও আদেশ বাস্তবায়নে আরও দুটি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়: একটি জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে গণভোট, অন্যটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। এভাবে জনগণকে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রাখা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণভোটের ফলাফল ও বিএনপির অবস্থান

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নাগরিকেরা নতুন সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটে অংশ নেন। সাড়ে সাত কোটির বেশি ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৬৮ শতাংশের রায় ছিল ‘হ্যাঁ’। গণভোটটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যেমন আগামী সংসদ কি আইনসভা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে? জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থায় কি মৌলিক পরিবর্তন করা হবে?

নির্বাচনের আগে পরিচালিত বেশ কয়েকটি জরিপে দেখা গেছে, নাগরিকেরা গণভোটের প্রশ্নগুলো এবং সংস্কারের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন এবং রাজনৈতিক শাসনকাঠামোয় পরিবর্তনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট স্পষ্টতই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপি গণভোটের ফলাফলকে সম্মান দেখাবে কি না, সেটি এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট। দলটি জুলাই আদেশের আইনসিদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় এ বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংবিধানে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে বিএনপি শপথ না নেওয়ার যে কারণ দিচ্ছে, সেটি সাংবিধানিকভাবে ভুল। এর কারণ, সংবিধানেরও ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ। ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ উল্লেখপূর্বক সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে এই ক্ষমতার স্বীকৃতি রয়েছে। অতএব, গণভোটে জনগণের বিপুল সমর্থন পাওয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতির দোহাই দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। সত্যিকার অর্থে গণভোটের সমর্থনের মাধ্যমে জুলাই সনদ এবং জুলাই আদেশ একধরনের সাংবিধানিক দলিলে পরিণত হয়েছে, যার ভিত্তি হচ্ছে গণসার্বভৌমত্ব।

গণভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য

গণভোট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফলাফল নির্ধারণে নাগরিকদের সরাসরি অভিপ্রায় ব্যক্ত করার সুযোগ দেয়। আর নাগরিকেরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অধিকতর গণতান্ত্রিক হয়। আমাদের মতো অপ্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কর্তৃত্ব শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ন্যস্ত করা হয়, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণকে সংকুচিত করে। রাষ্ট্রশাসন-সংক্রান্ত মৌলিক নীতি নির্ধারণে এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের একটি পন্থা হিসেবে গণভোট প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং সে কারণেই এটি সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষটি গুরুত্ব পাওয়ায় ১৯৭০ থেকেই গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় গণভোট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক হিসাবমতে, গত ৫০ বছরে বিশ্বে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০০টির বেশি হয়েছে সংবিধান সংশোধন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য।

বেশ কয়েকটি কারণে গণভোট এই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। প্রথমত, এটি নাগরিকদের সরাসরিভাবে রাজনৈতিক এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফলাফল নির্ধারণে এটি জনগণকে তার গণসার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করার ক্ষমতা প্রদান করে। তৃতীয়ত, গণভোট সম্মিলিত অভিপ্রায় প্রকাশ করার একটি উপায় নাগরিকদের দেয়, যা বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে গণসম্মতির ভিত্তিতে বৈধতা দেয়। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণসার্বভৌমত্ব সংস্কার প্রক্রিয়াটির ভিত্তি তৈরি করে এবং আইনসভা জনগণের অভিপ্রায়কে অগ্রাহ্য করতে পারে না।

জুলাই সনদের মূল বার্তা ও বর্তমান পরিস্থিতি

আইনি আলোচনা থাকা সত্ত্বেও জুলাই সনদের মূল বার্তাটি খুব স্পষ্ট। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমাদের দেশে উদার গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে নিয়ন্ত্রিত রাখার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারার এই ব্যর্থতা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু হতাশাব্যঞ্জক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। ঐতিহাসিক পটভূমিতে তৈরি হওয়া শক্তিশালী ব্যক্তিত্বনির্ভর, অত্যন্ত কেন্দ্রীয় এবং পরিবারতান্ত্রিক শাসন কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের কলুষিত রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

বর্তমান সরকারের মাত্র কয়েক সপ্তাহের শাসনামল আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কেন জুলাই সনদে প্রস্তাবিত টেকসই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থাটি আমাদের প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অন্যায্যভাবে বরখাস্ত করা, ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণের বিধিগুলো শিথিল করা, মেট্রোরেলের প্রধান নির্বাহীকে সরিয়ে দেওয়া এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান এবং সদস্যদের আপাতদৃষ্টে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ—এই সবকিছু কি সরকার এত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে পারত, যদি জুলাই সনদে বর্ণিত বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বয়ে গঠিত নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থা বলবৎ থাকত?

যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত না হয়, তবে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো এগিয়ে নিতে হবে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে, যা জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা প্রদান করে। কিন্তু সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত মতবাদের কারণে সংসদ সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তন করতে পারে না। এই মতবাদ অনুসারে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংবিধানের থেকে উদ্ভূত এবং সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। এর বিপরীতে সংবিধান প্রণয়নের গাঠনিক ক্ষমতা জনগণের হাতে—যার মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন কিংবা তার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায়—যাঁরা ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন।

মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পূর্ববর্তী কিছু উদ্যোগ, যেমন অষ্টম এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী, পরবর্তী সময়ে আদালত কর্তৃক বাতিল হয়েছে। এর ফলে ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে জুলাই সনদের মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা খুব সম্ভবত কোনো টেকসই উপায় হবে না। এই সমস্যা এখনো নিরসন করা সম্ভব, যদি বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করে।