জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উচ্চকক্ষ ও সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন। গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এই সনদে স্বাক্ষর করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে সাংবিধানিক পদে নিয়োগপদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।
উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
সংবিধান সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষকে 'অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়নমূলক' স্তর হিসেবে বিবেচনা করেছিল, যা নিম্নকক্ষের একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে পারে। বিএনপিসহ প্রায় সব দল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের পক্ষে হলেও উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষে নির্বাচন হবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে, যেখানে দলগুলো জাতীয় ভোটের অনুপাতে আসন পাবে। অন্যদিকে, বিএনপি চায় নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন, যা সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের মতো হবে।
উচ্চকক্ষ গঠন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে না, বরং এটি নির্ভর করে নির্বাচন পদ্ধতি ও ক্ষমতার ওপর। প্রস্তাবে উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে কোনো দলের একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, ফলে ভারসাম্যমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। এই পদ্ধতিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে দলকে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেতে হবে, যা অতীতের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ঘটেনি।
বিএনপির ভিন্নমত ও আলোচনার জটিলতা
বিএনপি উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি নিয়ে নোট অব ডিসেন্ট রেখেছে, এবং তারা চায় নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন। এতে উভয় কক্ষেই ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকতে পারে, যা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে ব্যর্থ করতে পারে। গত বছরের ২৯ জুন ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এই মতপার্থক্য উঠে আসে, যেখানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছিলেন, নিম্নকক্ষের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করলে তা 'রেপ্লিকা' হয়ে যাবে।
সংবিধান সংশোধন বিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে, যেখানে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। তবে বিএনপি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে, এবং তারা উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাঠানো ও পাস করানোর বিরোধিতা করে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস ও অন্যান্য সংস্কার
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেমন একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান পদে থাকতে পারবেন না, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধি সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমাবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রেও মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতির বিধান যুক্ত করা হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাবেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে গভর্নর, মানবাধিকার কমিশনসহ কিছু প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত পোষণ করে।
নারী প্রতিনিধিত্ব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষিত আসন ১০০টিতে উন্নীত করা এবং সরাসরি ভোটের প্রস্তাব ছিল, কিন্তু দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে এটি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে, আগামী নির্বাচনে দলগুলোকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে রাখার প্রস্তাবে সব দল একমত হলেও এর গঠনপদ্ধতি নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।
বাস্তবায়নের পথ ও গণভোট
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনায় গণভোটের প্রস্তাব গৃহীত হয়, যেখানে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো জনগণের সম্মতির জন্য উপস্থাপন করা হবে। গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে, যেখানে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। তবে বিএনপি এই আদেশকে অবৈধ বলে উল্লেখ করে এবং তারা ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে, যা মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন কতটা সম্ভব, তা এখনও একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব এ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।



