বাংলাদেশের আকাশসীমা নজরদারিতে যুগান্তকারী যুগের সূচনা
বাংলাদেশের আকাশসীমা নজরদারিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বসেছে অত্যাধুনিক রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো দেশের আকাশসীমা শতভাগ নজরদারির আওতায় আসবে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের উদ্বোধন করা হবে সোমবার (২০ এপ্রিল)।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ আকাশপথ
এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের পুরো আকাশসীমা নজরদারির আওতায় আসবে। এতে উড়োজাহাজ চলাচল আরও নিরাপদ হবে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ। বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, "সোমবার এটিসি টাওয়ার উদ্বোধন হবে। এটি উদ্বোধন করবেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী। সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীসহ সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।"
তিনি আরও বলেন, "এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন টাওয়ার, যা দ্বারা ফ্লাইট নিরাপদে ওঠানামার পাশাপাশি পুরো দেশের আকাশসীমা নজরদারির আওতায় এসেছে। দেশের আকাশসীমায় প্রবেশকারী কোনও ফ্লাইট নজরদারির বাইরে থাকবে না।"
ব্যয় বৃদ্ধি ও পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
প্রথমে এটিসির ব্যয় ৭৩০ কোটি টাকা নির্ধারণ হলেও পরবর্তীতে তা বেড়ে ৯৪২ কোটিতে দাঁড়ায় বলে জানান কাওছার মাহমুদ। আগের রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থাটি ছিল অনেক পুরোনো। ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের পুরো আকাশসীমা নজরদারির আওতায় আসতো না, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অংশ। এতে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতো বাংলাদেশ। কারণ নিয়ম অনুযায়ী, অন্য কোনও দেশের উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফি নেওয়ার বিধান আছে। আকাশসীমা একবার ব্যবহারের জন্য 'ফ্লাইং ওভার চার্জ' নামের এই ফি পেতো না বাংলাদেশ।
এটিসি টাওয়ার প্রকল্পের পটভূমি
২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফ্রান্স দূতাবাস থেকে তাদের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি থ্যালেস রাডার ও এটিএম-সিএনএস সিস্টেম এবং এটিসি টাওয়ার ও এটিএম পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। দেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নিরাপত্তা মান নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ৮ মে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন করে।
পরবর্তী সময়ে সরকার একটি জি-টু-জি কমিটি এবং একটি কারিগরি উপ-কমিটি গঠন করে। কারিগরি প্রস্তাবের বিষয়ে আইসিএও'র মতামত নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জি-টু-জি কমিটি কারিগরি প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হয়। ওই বছরের ৩ নভেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং ১৪ ডিসেম্বর আর্থিক উপ-কমিটি আর্থিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেয়।
অবশেষে ২০২০ সালের ২২ থেকে ২৪ তারিখে একটি আর্থিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, পরবর্তীকালে অনলাইনে আর্থিক প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি প্রস্তাবটির অনুমোদন দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নের পরিবর্তে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৩১ মার্চ সিসিইএ'র সভায় প্রকল্পটি সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়।
এটিসি টাওয়ারের নজরদারি ক্ষমতা
এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডারটি ৮০ নটিক্যাল মাইল কভারেজ দেবে। আর মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডারটি ২০০ নটিক্যাল মাইল কভারেজ দেবে। বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পটি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশের আকাশসীমা নজরদারি ও যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এটি কলকাতা ও ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস ইন্টার-ফ্যাসিলিটি ডেটা কমিউনিকেশন বাস্তবায়নের পথও খুলে দিয়েছে। এই অঞ্চলে একটি নিরবচ্ছিন্ন আকাশ প্রতিষ্ঠার জন্য এই এআইডিসি ছিল অত্যন্ত প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের জন্য রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রাপ্তি, উন্নত মনিটরিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট আরও সহজ ও কার্যকর হবে। এর ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফ্লাইট পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং আকাশসীমার ব্যবহার আরও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব হবে।
এটিসির প্রয়োজনীয়তা ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
বেবিচকের কর্মকর্তারা জানান, গত ৫৪ বছর এটিসি অটোমেশন না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র ভেরি হাউ ফ্রিকুয়েন্সির সাহায্যে এবং ঢাকায় সীমিত পরিসরে রাডারের সহায়তায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা ও সিএনএস ইঞ্জিনিয়াররা এ ব্যবস্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসছে। এটিসি অটোমেশন ছাড়া আকাশপথে বিমানগুলোকে সেবা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি হচ্ছে সোমবার।
কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিদিন অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, প্রবাসী যাত্রী পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আকাশসীমায় বিমান চলাচলের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত ট্রাফিক দক্ষতার সঙ্গে সেবা দেওয়ার জন্য একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম খুবই প্রয়োজন ছিল।
আগে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল করার সিস্টেমটি ছিল প্রায় চার দশকের পুরোনো। রাডারটিও ছিল প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো। এই সময়ের মধ্যে বিমান চলাচল প্রযুক্তি, সিস্টেম এবং পদ্ধতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই ক্রমবর্ধমান এয়ার ট্রাফিক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন ছিল অপরিহার্য।



