সুন্দরবনে মধু আহরণে বনদস্যুদের আতঙ্ক, মৌয়ালদের জীবিকা হুমকির মুখে
সুন্দরবনে মধু আহরণে বনদস্যুদের আতঙ্ক, মৌয়ালদের সংকট

সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুমে বনদস্যুদের আধিপত্য, মৌয়ালদের জীবিকা সংকট

পয়লা এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বন বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বনদস্যুরা। খুলনার কয়রা অঞ্চলের মৌয়ালদের মধ্যে যে হাহাকার ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর সংকট নয়; বরং সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

বনদস্যুদের চাঁদাবাজি: মৌয়ালদের জন্য দুঃসহ পরিস্থিতি

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো সত্যিই শিউরে ওঠার মতো। বনের ভেতরে বাঘ বা কুমিরের চেয়েও এখন বড় ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের তৈরি ‘দস্যু বাহিনী’। একেকটি নৌকার জন্য ৫০ হাজার টাকা বা জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মৌয়ালদের পক্ষে বনে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নেওয়ার সাহসও পাচ্ছেন না কেউ। দস্যুদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ ছাড়া কাজ করা অসম্ভব—মৌয়ালদের এই আক্ষেপ প্রমাণ করে যে বনের গভীরে এখনো আইনের শাসনের চেয়ে দস্যুদের ফরমান বেশি কার্যকর।

জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব: মধু আহরণ হ্রাস ও মৌয়াল সংখ্যা কমে যাওয়া

সুন্দরবনের মধু কেবল মৌয়ালদের জীবিকা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সরকারের রাজস্বের বড় উৎস। গত বছর মধু আহরণ ৩৫ শতাংশ কমে যাওয়া এবং মৌয়ালের সংখ্যা ৮ হাজার থেকে ৫ হাজারে নেমে আসা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে সুন্দরবনের বনজীবীরা ধীরে ধীরে তাঁদের পৈতৃক পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এবারের মৌসুমের শুরুতেই যে নীরবতা কয়রা বা শাকবাড়িয়া নদীর তীরে দেখা যাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, বাজারে মধুর তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা: কোথায় ফাঁক রয়ে গেছে?

কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জোনাব বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী বা দুলাভাই বাহিনীর মতো নামগুলো যখন মৌয়ালদের মুখে মুখে ঘোরে এবং তারা প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করার দুঃসাহস দেখায়, তখন বুঝতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় কোথাও বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। কেবল একটি আস্তানা ধ্বংস বা একজন জিম্মি উদ্ধারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দস্যুদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি উপড়ে ফেলা এবং মৌয়ালদের মনে নিরাপত্তার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।

সমাধানের পথ: জোরদার টহল ও সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা

আমরা মনে করি, মধু আহরণের এই দুই মাস সুন্দরবনের ভেতরে টহল ব্যবস্থা শুধু জোরদার নয়, নিশ্ছিদ্র করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মৌয়ালেরা যেসব গহিন অঞ্চলে মধু সংগ্রহ করেন, সেখানে ড্রোন পর্যবেক্ষণ বা বিশেষ মোবাইল টহল দল মোতায়েন করা যেতে পারে। পাশাপাশি মৌয়ালদের দাদন দেওয়া ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

সুন্দরবনের মধু আহরণ শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য রোধ করে মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা এবং মৌয়ালদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।