পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের প্রথম বৈঠক, সীমান্ত জমি হস্তান্তরের নির্দেশ
পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের বৈঠক, সীমান্ত জমি হস্তান্তর

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিজেপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। সোমবারের ওই বৈঠক থেকে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতার নির্মাণের জন্য ঝুলে থাকা জমি আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) হস্তান্তরের নির্দেশ।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় এই জমি অধিগ্রহণ ইস্যুটি ছিল অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার অভিযোগ করেছিলেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই জমি হস্তান্তরে বাধা দিচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আগের সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করতে এই প্রকল্পগুলো আটকে রেখেছিল। আমরা সেই সব বাধা অপসারণ করেছি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিসংখ্যান কী বলছে?

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমএইচএ) সংসদীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সীমান্তের প্রায় ১৪৯ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ঝুলে রয়েছে। গত আগস্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদে জানায়, পশ্চিমবঙ্গের ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এখনও কাঁটাতারবিহীন। এর মধ্যে ১১২.৭৮০ কিমি এলাকায় কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব নয় (নন-ফিজিবল) এবং ৪৫৬.২২৪ কিমি এলাকায় কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যে ৪৫৬ কিমি এলাকায় কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব, তার মধ্যে মাত্র ৭৭.৯৩৫ কিমি জমি নির্মাণ সংস্থাকে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৩৭৮.২৮৯ কিমি এলাকার মধ্যে ১৪৮.৯৭১ কিমি জমির জন্য রাজ্য সরকার এখনও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াই শুরু করেনি। বাকি ২২৯.৩১৮ কিমি জমি অধিগ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে রয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ?

গত বছর ডিসেম্বরে লোকসভায় নির্বাচনি সংস্কার নিয়ে বিতর্কের সময় অমিত শাহ মমতা সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর মধ্যে কেবল পশ্চিমবঙ্গই কাঁটাতারের কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। শাহের দাবি ছিল, ২ হাজার ২১৬ কিমি সীমান্তের মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিমি এলাকায় কাঁটাতার দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫৬৩ কিমি যে বাকি রয়ে গেছে, তার একমাত্র কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘অনিচ্ছা’।

অমিত শাহ সরাসরি বলেছিলেন, ‘অনুপ্রবেশ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়েই হচ্ছে। আপনারা (টিএমসি) যদি অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তবে সেখানে বিজেপির জয় নিশ্চিত।’

একই সুর শোনা গিয়েছিল সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কণ্ঠেও। গত ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে তিনি জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধীর ও জটিল নীতি অনুসরণ করে। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত রক্ষার কাজেও রাজ্য অসহযোগিতা করছে।

কেন জমি অধিগ্রহণে দেরি হচ্ছিলো?

সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক কারণই বাধা ছিল না। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি রয়েছে, যেখানে বছরে তিনটি ফসল ফলে। এই সমৃদ্ধ কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা প্রশাসনিকভাবে বেশ জটিল।

২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপন আইন অনুযায়ী, স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া কৃষকদের মধ্যে জীবিকা হারানোর ভয় এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ১৫০ গজ ভেতরে কাঁটাতার নির্মাণের ফলে নিজেদের জমি ‘পরিত্যক্ত’ হওয়ার আশঙ্কা জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছিল।

আদালতের হস্তক্ষেপ ও তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি

গত নভেম্বরে কলকাতা হাইকোর্ট মমতা সরকারকে একটি হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত জানতে চেয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকার জমির টাকা দিয়ে দেওয়ার পরেও কেন জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে না। অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী আদালতে জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকার জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে মোটেও আন্তরিক নয়।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস বারবারই কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে এসেছে। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘অনুপ্রবেশ কেবল পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা নয়। আসাম ও ত্রিপুরার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যেও এটি ঘটছে। শাহ কেন বলতে পারছেন না যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার থাকা সত্ত্বেও সেখানে কেন অনুপ্রবেশ থামছে না? বিএসএফ তো তারই অধীনে।’