অবৈধ উপায়ে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কিছু বাকি থাকলে ইমিগ্রেশন পার হতে পারেন না। তবে এই সমস্যা কাটিয়ে বিনা বাধায় ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দিতেই কাজ করে একটি অসাধু চক্র। যাদের ভাষায় এটি বলা হয় ‘বডি কন্ট্রাক্ট’। এক্ষেত্রে প্রতি জনের কাছে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে চক্রটি।
সম্প্রতি এই চক্রের অন্যতম হোতার সন্ধান পেয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি বলছে, চক্রটির অন্যতম হোতা আব্দুল বারী মোল্লা তাদেরই এক কর্মচারী। তিনি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অ্যারোড্রাম অপারেটর হিসেবে কর্মরত। চাকরি তার এটা হলেও গোপনে মানবপাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছেন বিশাল নেটওয়ার্ক। মানবপাচারের বিভিন্ন ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দিতে কাজ করে তার সিন্ডিকেট। আর তার এই সিন্ডিকেটে সম্পৃক্ত রয়েছেন ইমিগ্রেশনে কর্মরত পুলিশ ও দেশি বিদেশি এয়ারলাইন্সের কর্মীরাও।
তদন্তে নতুন মোড়
আব্দুল বারী মোল্লার বিরুদ্ধে এরইমধ্যে তদন্তও শুরু করেছে বেবিচক। তবে তদন্ত চলাকালে আরও ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে বারী মোল্লার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বেবিচকের প্রশাসন বিভাগের যে কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন, তাদের ওপরও নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বারী মোল্লা। বেবিচকের বাইরে সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে ফোন করে তদন্তকাজে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টাও করছেন তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চক্রটি ওমরা ভিসায় সৌদি, কাতার, মিশর বা সিরিয়া হয়ে নৌপথে ইতালি এবং ভারত, শ্রীলংকা, দুবাই, কাতার, মিশর বা সিরিয়া হতে নৌপথে ইতালি পাঠায়। সম্প্রতি ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ২০ জনের অধিক বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই বিষয়ে তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশও দেয়।
বেবিচকের সদস্য প্রশাসন অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বারী মোল্লার বিষয়টি তদন্ত করছি। তদন্তে যা আসবে তার ওপরই ভিত্তি করে আমরা ব্যবস্থা নেব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কে কাকে ফোন করলো এসব বিষয়ে তদন্তের ওপর প্রভাব পড়বে না। বেবিচকে অপরাধীর ঠাঁই নেই, হবেও না। আমরা সবসময় এগুলোর ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে আছি এবং থাকবো।’
বারী মোল্লাহ তার কয়েক সহযোগী ও কোন কোন এয়ারলাইন্স ভয়ংকর এই ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ মানবপাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; তার পুরো ফিরিস্তি বাংলা ট্রিবিউনের নিকট এসেছে। সেই ফিরিস্তি ধরে অনুসন্ধানে মিলেছে ভয়াবহ সব তথ্য।
যেভাবে বারী মোল্লার সিন্ডিকেটের তথ্য সামনে আসে
গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার সময় চার যাত্রীকে ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে অফলোড করলে মানবপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এরপর চালানো হয় নজরদারি। এতেও আইনবহির্ভূতভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে যাত্রীদের বিদেশে পাঠিয়ে থাকে এমন প্রমাণও চলে তদন্তকারীদের হাতে।
এক্ষেত্রে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওমরা ভিসায় সৌদি আরব যান। এরপর কাতার বা মিশর, সিরিয়া হয়ে নৌপথে ইতালি এছাড়াও ভারত অথবা শ্রীলংকা, দুবাই হয়ে কাতার বা মিশর তারপর সিরিয়া হতে নৌপথে ইতালি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমানবন্দরে কর্মরত হওয়ার সুবাদে বারী মোল্লার সঙ্গে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে তার যোগসাজশ কাজে লাগিয়ে সে অন্তত প্রতিসপ্তাহে ১৫ হতে ২০ জন পর্যন্ত ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে থাকে। এমনকি গতবছরের ২১ অক্টোবর সর্বোচ্চ ৩০ জন ব্যক্তিকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। এক্ষেত্রে, জনৈক মো. আলাল, বারী মোল্লার ভাগনে সাখাওয়াত, শিফা এয়ার ট্রাভেলস এর মালিক আমিনুল ইসলাম কায়কোবাদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি টিকেট ও ভিসা নিশ্চিত করে থাকে। ইমিগ্রেশন পুলিশের বিভিন্ন পালায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের অর্থের বিনিময়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন ও আইএনএস সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ গোপন ভিত্তিতে বিমানবন্দরে অভিযান পরিচালনা করে এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স। অভিযানে অবৈধ পথে বিদেশ গমনেচ্ছু পাঁচ ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এরই সূত্র ধরে ৯ ঘণ্টাব্যাপী তল্লাশি চালিয়ে পুরো চক্রটি উন্মোচন করা হয়। বিমানবন্দরের টাওয়ার বিল্ডিংয়ে বারী মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ওই সময় গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি টের পেয়ে বারী মোল্লা তার ব্যবহৃত এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি টাওয়ার বিল্ডিংয়ের পেন্ট্রি রুমের (ক্যান্টিন) গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখেন। পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার লুকানো মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোন পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, উক্ত ফোন হতে ইমিগ্রেশন পুলিশ, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ার ইন্ডিয়া এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট যাত্রীর নম্বরে পাসর্পোট, টিকিট ও কোড নম্বর প্রেরণ এবং পারস্পরিক কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বারী মোল্লা তার অপরাধ অস্বীকার করলেও, পরবর্তী সময়ে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদে ভবিষ্যতে এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত হবেন না বলে স্বীকারোক্তি দেন।
এ বিষয়ে বারী মোল্লার সঙ্গে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করলে বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মানবপাচারে যুক্ত এয়ারলাইন্সকর্মীও
তদন্ত সংস্থা ও অনুসন্ধানে ভয়াবহ এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্সের কর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এই এয়ারলাইন্সগুলো হলো— বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স, এয়ার ইন্ডিয়া, জজিরা এয়ারলাইন্স ও সালাম এয়ার।
সংস্থার প্রতিবেদনে এই এয়ারলাইন্সগুলোর কর্মীদের সঙ্গে বারী মোল্লার সখ্যতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কবে কখন কীভাবে তাদের দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, তারও তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনেরও প্রমাণ উঠে এসেছে। এমনকি ইন্ডিগো এয়ারের কিছু কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সে এই অবৈধ কাজ করেছে। এ ব্যাপারে ইন্ডিগো এয়ারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়টি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ওয়াকিবহাল। এ কারণে আমরা আমাদের সবচেয়ে সৎ কর্মীদের পোস্টিং দেই। যারা কাউন্টারে নিযুক্ত থাকেন তাদের আমরা গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখি। বোর্ডিং পাসের পর ইমিগ্রেশন এবং শেষ পর্যন্ত এয়ারক্রাফটে উঠারও সময় আমরা চেক করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে এগুলো ছিল, তবে বর্তমানে শূন্যের কোটায়। বিমান বাংলাদেশ এগুলোকে কখনই প্রশ্রয় দেয় না। যদি আমরা জড়িত থাকার প্রমাণ পাই, তবে তার চাকরি থাকে না।’
ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গেও বারী মোল্লার সংশ্লিষ্টতা
তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলেন, যাত্রীকে কোড প্রদান এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অ্যারোড্রাম অপারেটর বারী মোল্লার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তে প্রতীয়মাণ হয় আব্দুল বারী মোল্লা ঢাকা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বাঘা, রাজশাহী কেন্দ্রীক বিভিন্ন মানবপাচার সিন্ডিকেটের বিমানবন্দর প্রতিনিধি হিসেবে কর্যক্রম পরিচালনা করে। সকল সিন্ডিকেটের বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বার হিসেবে তিনি কাজ করে থাকেন।
কর্মকর্তারা বলেন, বিমানবন্দরের কর্মরত অবস্থায় মানবপাচারের মতো অন্যায় কার্যকলাপে জড়িত হওয়া সম্পূর্ণভাবে অনভিপ্রেত। এই চক্রের মূল হোতা অ্যারোড্রাম অপারেটর আব্দুল বারী মোল্লাকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। দোষীদের চিহ্নিত করে ইতিমধ্যে ব্যবস্থাও নেওয়াও শুরু হয়েছে।’
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করে মানবপাচার যে হয়, সেটি বলতেই হবে। কেননা আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন দেশ থেকে ডিপোর্ট হয়ে যাত্রী ফেরত আসতে।’ তিনি বলেন, ‘এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রী পরিবহন করে। যাত্রীর ডকুমেন্টস দেখার আলাদা লোক বা সংস্থা রয়েছে। তারা ওকে করে দিলে এয়ারলাইন্সে উঠে যায় যাত্রী। এদিকে কোনো কর্মী এই ধরনের কাজে জড়িত কিনা, আমরা সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি। আমাদের বিভিন্ন সংস্থা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।’



