রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা: বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভবিষ্যৎ: বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা: বিএনপি সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা বঙ্গভবনের সামনে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক কারণে তাকে সরাতে রাজি হয়নি। দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপিও তখন এ বিষয়ে সমর্থন দেয়নি। ফলে সেই দাবি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও পরবর্তী অবস্থান

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধীনেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকার-প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। তারপরও রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মাঝে মাঝে উত্তপ্ত হয়েছে রাজপথ। তবে তিনি বহাল তবিয়তেই থেকে যান। গত সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন ও নিয়মিত রুটিন কাজ ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এড়াতে রাষ্ট্রীয় অনেক আচার-অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি ছিল না। রাষ্ট্রীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অপাংক্তেয়। এমনকি জাতীয় ঈদগাহেও তিনি নামাজ পড়তে যেতে পারেননি।

নতুন সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এবারও অনেকে মনে করেছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে হয়তো দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে গত দুই মাসের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার-প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানেই যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে চলমান বিতর্ক

এত কিছুর পরও রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তিনি কী পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন? বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে? তার স্থলে কে আসতে পারেন? পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিএনপি থেকে কেউ হচ্ছেন? নাকি দলের বাইরে কাউকে দেওয়া হতে পারে? এ নিয়ে এখনও নানা আলোচনা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা জানান, বিএনপিতেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো ক্যারিয়ারসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী আছেন। হয়তো তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হতে পারে। আর দলের বাইরে কাউকে আনার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার আগ পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

আলোচনায় চার বর্ষীয়ান নেতা

বর্তমান রাষ্ট্রপতি যতদিনই থাকুন, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন—রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির ভেতর থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি দলনিরপেক্ষ কাউকে করা হবে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। দলীয় সূত্র জানায়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও সিনিয়র নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্র জানায়, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদানের কারণে হাইকমান্ডের গুডবুকে রয়েছেন তিনি।

এর বাইরে নতুন সরকারের কোনও পদে না থাকলেও আলোচনায় রয়েছেন আরও তিন বর্ষীয়ান নেতা। তারা সবাই স্থায়ী কমিটির সদস্য। এর মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও ড. আব্দুল মঈন খান। বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, এই চার শীর্ষ নেতাই দলের পরীক্ষিত। যোগ্যতার দিক থেকেও অবিসংবাদিত।

নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকা থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। এই চার নেতার মধ্যে মির্জা ফখরুল সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। দল চাইলে পরবর্তী সময়ে তাকে রাষ্ট্রপতিও করা হতে পারে। আর ড. মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও ড. আব্দুল মঈন খান সরকারের কোনও পদে স্থান পাননি। ২০০১-২০০৬ সালে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। তখন তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিও ছিলেন। আর ড. মোশাররফ ও মঈন খানও একাধিকবার মন্ত্রী-এমপির দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, বড় পদের জন্য হয়তো তাদের রিজার্ভ রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া

৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। তবে ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।

মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।

পদ শূন্য হয় কীভাবে?

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, শারীরিক অসামর্থ্য বা অভিশংসন হলে এই পদ শূন্য হয়। এ ছাড়া গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের কারণেও রাষ্ট্রপতি অপসারিত হতে পারেন। আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার।

কতদিন থাকবেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি?

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। সে হিসাবে তার স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। যদিও গত ডিসেম্বরে রয়টার্সের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ‘অপমাণিত’ বোধ করছেন।

সর্বশেষ গত ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিতে গেলে প্রধান বিরোধী দলের সদস্যরা বাধা দেন। তবে সব ক্ষেত্রেই এই সরকারের আনুকূল্যে আছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডাক পেয়েছেন রাষ্ট্রপতিও। তাই আপাতত রাষ্ট্রপতি একটু চাপমুক্ত আছেন। এ অবস্থায় আলোচনা হচ্ছে তিনি কি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন, নাকি সরকার তাকে সরিয়ে দেবে? নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নানা কারণে এই রাষ্ট্রপতির পূর্ণ মেয়াদে থাকার সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে নতুন মুখ আসতে পারে।

বিএনপির ভাবনা

বর্তমান রাষ্ট্রপতি কতদিন থাকবেন বা ভবিষ্যতে বিএনপি থেকে কেউ রাষ্ট্রপতি হবেন কিনা—এ নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা হচ্ছে। যদিও নেতারা সরাসরি এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার কোনও আকাঙ্ক্ষা আছে কিনা, সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘এ ধরনের প্রত্যাশা আমার কখনোই ছিল না। আমি এ পর্যন্ত যেখানে এসেছি, সেটা আমার ভাগ্য নিয়ে এসেছে।’’

বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষের আগে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে বা বিএনপির কোনও বর্ষীয়ান নেতা রাষ্ট্রপতি হবেন কিনা—এমন প্রশ্নে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সরাসরি কোনও উত্তর দেননি। বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে এখনও কিছু বলার সময় হয়নি।’’