পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন বিজেপি সরকারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে ‘নির্লজ্জ আঁতাতের’ অভিযোগ তুলে তোপ দেগেছেন বিভিন্ন বিরোধী দলের জাতীয় নেতারা।
রাহুল গান্ধীর প্রতিক্রিয়া
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এ বিষয়ে একটি খবরের শিরোনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা (সিইও) মনোজ আগরওয়ালকে নতুন মুখ্য সচিব এবং বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। হিন্দিতে লেখা ক্যাপশনে রাহুল বলেন, ‘বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের এই “চোরের বাজারে” চুরির আকার যত বড়, পুরস্কারের বহরও তত বড়।’
কংগ্রেসের অভিযোগ
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (যোগাযোগ) জয়রাম রমেশ গত সোমবার বলেন, ‘এসব নিয়োগ বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার নির্লজ্জ আঁতাতেরই প্রতিফলন। এই আঁতাত আড়াল করার বা গোপন রাখার আর কোনো চেষ্টাই এখন নেই।’ রমেশের দাবি, এসব নিয়োগ প্রমাণ করে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ছিল না। তারা কেবল বিজেপিকে সুবিধা দিতেই কাজ করেছে। জয়রাম রমেশ আরও বলেন, ‘২৭ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করে একটি রাজ্যে নির্বাচন হলো। বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা দিতে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সুকৌশলে এ কাজটি করেছে।’
সরকারি রদবদল
সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত রোববার পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমলাতন্ত্রে রদবদল করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে (সিএমও) দুজন আইএএস এবং সাতজন ডব্লিউবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুব্রত গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। আর শান্তনু বালা মনোনীত হন তাঁর একান্ত সচিব হিসেবে।
বিজেপির জবাব
বিরোধীদের এমন অভিযোগের জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিজেপি। গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘তিনি (আগরওয়াল) কেবল সাবেক সিইও নন, তিনি রাজ্যের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ আমলাও। অন্য কিছু বলার থাকলে অন্যদের বলুন। আমরা অর্থাৎ বিজেপি সরকার আইন মেনেই কাজ করছি।’ পিটিআইকে বিজেপি নেতা শাহনওয়াজ হোসেন বলেন, ‘তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার আগে কি আমাদের তৃণমূলের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে?’ শাহনওয়াজ আরও বলেন, ‘বাংলার মুখ্য সচিব কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সরকারের আছে। মনোজ আগরওয়াল একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। এই পদ কি তৃণমূলের কোনো কর্মীকে দিয়ে দেওয়া উচিত?’ উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী নরেন্দ্র কাশ্যপ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের শাসনের ভেতরে ছিল। তাই রাজ্যকে সঠিক পথে ফেরানো মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য তিনি যোগ্য কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেবেন।’
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
গত মঙ্গলবার পিটিআইকে তৃণমূলের সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ বলেন, ‘এটা পরিষ্কার, বাংলায় এখন “কলিযুগের রামরাজত্ব” চলছে। মনোজ আগরওয়ালের মতো একজন ব্যক্তি, যাঁর নিরপেক্ষ আম্পায়ার হওয়ার কথা ছিল, তাঁকে রাজ্যের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। আর সুব্রত গুপ্ত, যাঁর ৩০ লাখ ভোটারের বিষয়টি দেখার কথা ছিল, তিনি এখন মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা। আমরা শুরু থেকেই জানতাম, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন যোগসাজশ করছে। তারা ভোটে জেতেনি, কারসাজি করে জিতেছে।’ তৃণমূলের আরেক সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সাগরিকা লেখেন, ‘বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে যারা তথাকথিত “নিরপেক্ষ আম্পায়ার” হিসেবে কাজ করলেন এবং লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি তদারকি করলেন, তাঁদেরই এখন বিজেপি সরকারের শীর্ষ আমলা বানানো হয়েছে। এটা কি কোনো অনৈতিক সুবিধা দেওয়া নয়? ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে কেউ কি এখন বিশ্বাস করেন? দেশ আজ এই প্রশ্ন করার অধিকার রাখে।’
বিশেষজ্ঞ মতামত
অবসরপ্রাপ্ত এক আইএএস কর্মকর্তা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে বলেন, এর আগে কোনো রাজ্যের সাবেক প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তাকে নতুন সরকারের মুখ্য সচিব করার কথা তাঁর মনে পড়ছে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অন্য রাজ্যের আমলাতন্ত্রে পদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারা এর আগেও রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। যেমন মনোহর সিং গিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের ১১তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন, রাজ্যসভার সদস্য হন এবং কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীও হয়েছিলেন। এমনকি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কারিগর হিসেবে পরিচিত টি এন শেশানও প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে লড়েছিলেন।



