রাজনীতি জীবিকার বিকল্প নয়, আত্মনির্ভরশীলতাই শক্তি
রাজনীতি জীবিকার বিকল্প নয়, আত্মনির্ভরশীলতাই শক্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অধ্যায়গুলো কখনোই কেবল নেতৃত্বের কৃতিত্বে রচিত হয়নি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল ভিত্তি থাকে তৃণমূলের সেই অসংখ্য নেতাকর্মী, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে ধরে রাখেন। বিএনপির ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়। গত প্রায় ১৭ বছর ধরে মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, গুম-খুনের আতঙ্ক, আর্থিক ক্ষতি এবং সামাজিক নানা চাপের মধ্য দিয়ে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, ব্যবসা কিংবা চাকরির ক্ষতি স্বীকার করে দলীয় আদর্শের প্রতি অনুগত থেকেছেন। ফলে তাদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, দল শক্তিশালী অবস্থানে গেলে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে তাদের ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। এই প্রত্যাশা অস্বাভাবিক নয়। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি মানবিক ও স্বাভাবিক অনুভূতি।

কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। রাজনীতি কখনোই ব্যক্তিগত জীবনের একমাত্র ভরসা হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক দল তার কর্মীদের জীবনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহন করতে পারে না, কিংবা করা উচিতও নয়। রাজনৈতিক সংগঠন মূলত আদর্শ, নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্ল্যাটফর্ম। এর কাজ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের জন্য নীতি নির্ধারণ করা। কিন্তু লাখো নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কোনো দলের পক্ষেই বাস্তবসম্মত নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনীতিকে জীবিকা না বানানোর আহ্বান

সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন রাজনীতিকে জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে দেখা শুরু হয়। তখন আদর্শের জায়গায় প্রত্যাশা, প্রত্যাশার জায়গায় দাবি, আর দাবি পূরণ না হলে হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নেয়। এই ক্ষোভ অনেক সময় সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি তৈরি করে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করে দেয়। ফলে ত্যাগ ও আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিস্বার্থ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু নেতাকর্মী বছরের পর বছর রাজনীতির পেছনে সময় ব্যয় করতে গিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে ফেলেছেন। কেউ ব্যবসা হারিয়েছেন, কেউ চাকরির সুযোগ হারিয়েছেন, কেউবা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সময় পাননি। পরবর্তীতে তারা দলীয় সুযোগ-সুবিধার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, রাজনৈতিক সংগঠনের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য প্রয়োজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, আত্মনির্ভর এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী। এমন মানুষ, যারা ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত থেকেও আদর্শের জন্য রাজনীতি করবেন। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা কোনো না কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তারা ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আইনজীবী, কৃষক, চিকিৎসক বা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলেন। ফলে রাজনৈতিক অবস্থান বা ক্ষমতার পরিবর্তন তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে বিপর্যস্ত করে না। বরং এই স্বাধীন অবস্থান তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অধিকতর সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ করে তোলে।

আত্মনির্ভরতা: বর্তমান সময়ের দাবি

তাই বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মনির্ভরতা। ব্যবসা, চাকরি, কৃষি, প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অন্য যেকোনো উৎপাদনশীল খাতে দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। যে নেতাকর্মী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন, তিনি রাজনীতিতেও অধিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারবেন। কারণ তার রাজনৈতিক অবস্থান কোনো ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের উপর নির্ভর করবে না।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার যে ভঙ্গুর, সংকটাপন্ন ও প্রায় বিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, সেই বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক সংস্কার একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত মূল্যায়ন যদি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে সেটিকে চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সবসময় সক্রিয় থাকে, যারা ত্যাগী নেতাকর্মীদের হতাশা ও ক্ষোভকে পুঁজি করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে। তারা বিভ্রান্তি ছড়ায়, অবিশ্বাস তৈরি করে এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ ধরনের অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

রাজনীতিতে অধিকার অর্জন

রাজনীতিতে অধিকার কেউ কাউকে উপহার দেয় না, তা অর্জন করে নিতে হয়। তবে সেই অর্জনের পথ হওয়া উচিত সাংগঠনিক, গণতান্ত্রিক এবং গঠনমূলক। ত্যাগী নেতাকর্মীদের দায়িত্ব সরকার ও দলের পাশে থাকা, ভুলত্রুটি হলে তা যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সবশেষে একটি কথাই বলা যায়—রাজনৈতিক দল আদর্শ ও সংগ্রামের জায়গা, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের বিকল্প নয়। দল একজন কর্মীকে রাজনৈতিক পরিচয় দিতে পারে, সংগ্রামের প্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেই নিতে হয়। তাই দলের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বজায় রেখেও নিজের ভাগ্যের চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখাই হবে একজন সচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও দূরদর্শী রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি। লেখক: রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।