আমাদের দেশে জনপ্রিয় প্রবাদ হলো, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না।’ এই প্রবাদটি মূলত দোষী ব্যক্তির মনে জমে থাকা অপরাধবোধ ও অসচেতনভাবে নিজের অপরাধ ফাঁস করে দেওয়ার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। কেউ কোনও অন্যায় বা চুরি করার পর ধরা পড়ার ভয়ে এতটাই তটস্থ থাকে যে, সাধারণ কোনও প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসার মুখে পড়লেই সে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নিজের দোষ ঢাকার চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো নিজেকেই সবার সামনে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করে ফেলে। সহজ কথায়, নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে সত্য বের হয়ে যাওয়ার বা ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ’ থাকার বিষয়টিকে বোঝাতে এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের অবস্থা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের বর্তমান অবস্থাও অনেকটা সেরকম। একসময় যারা রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, আজ তাদের অনেকেই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছেন— কে কত বেশি নির্দোষ, কে কত কম জানতেন, আর কে কত দূরে ছিলেন সেই বহুল আলোচিত ‘কিচেন কেবিনেট’ থেকে, তা প্রমাণ করার জন্য।
বিতর্ক ও প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে যা ঘটেছে, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চরম ব্যর্থতা, মবতন্ত্রের উত্থান, প্রশাসনের দলীয়করণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বানিয়ে রাখা— নানা বিষয়ে জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্ন জমা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে আরেকটি অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্রের অস্তিত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘সরকারের ভেতরে একটি ছোট বলয় ছিল, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।’ এরপর একে একে অনেকেই জানাতে শুরু করেছেন— তাঁরা সেই বলয়ের অংশ ছিলেন না।
দায় অস্বীকারের প্রতিযোগিতা
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, তিনি ওই কিচেন কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না। আসিফ মাহমুদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, তাঁকে সেখানে রাখা হয়নি। তৌহিদ হোসেন নিজেও দাবি করেছেন, তিনি বিষয়টি জানতেন, কিন্তু সদস্য ছিলেন না। অন্যরাও বিভিন্নভাবে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এমন কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্বই অস্বীকার করছেন।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। যদি সবাই বাইরে থাকেন, তাহলে ভেতরে ছিলেন কারা? যদি কেউই কিছু না জানেন, তাহলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিলো কে? যদি কেউই দায়িত্বশীল না হন, তাহলে সেই সময়কার বিতর্কিত নীতিগুলোর দায় কার?
রাষ্ট্র পরিচালনা ও দায়
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনও ব্যক্তিগত আড্ডা নয়। এটি একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। সেখানে ‘আমি জানতাম না’, ‘আমাকে ডাকা হতো না’, ‘আমি বৈঠকে ছিলাম না’— এই ধরনের বক্তব্য হয়তো ব্যক্তিগত দায় কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দায় থেকে মুক্তি দেয় না। কারণ মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ ছিলেন। সিদ্ধান্তের সুবিধা ভোগ করলে সিদ্ধান্তের দায়ও নিতে হয়।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব অভিযোগ ও অস্বীকৃতি তখন সামনে আসেনি, যখন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছিল। তখন কেউ প্রকাশ্যে আপত্তি জানাননি। কেউ জনগণকে সতর্ক করেননি যে, রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি ক্ষমতাকেন্দ্র কাজ করছে। কেউ নীতিগত অবস্থান থেকে পদত্যাগ করেননি। বরং সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রভাব ব্যবহার করেছেন এবং ক্ষমতার অংশ হিসেবেই পরিচিত হয়েছেন।
এই নীরবতাও এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান। ইতিহাসে অনেক সময় কথার চেয়ে নীরবতা বেশি অর্থবহ। যখন কোনও সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে, তখন চুপ থাকা এবং পরে এসে দায় অস্বীকার করা রাজনৈতিক সততার পরিচয় নয়। বরং এটি পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর নিজেকে নিরাপদ রাখার কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়।
প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ
প্রশ্ন হলো, এখন কেন এই দায় অস্বীকারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো— রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন। ক্ষমতার বলয়ে থেকে অনেক কিছু বলা যায় না, কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব কমে গেলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে এখন জনপরিসরে আলোচনা বাড়ছে। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চুক্তি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনও ধরনের রাজনৈতিক বা আইনি জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই অবস্থায় অনেকেই হয়তো আগেভাগেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চাইছেন। তারা ভবিষ্যতের ইতিহাসে নিজেদের নাম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তালিকা থেকে সরিয়ে রাখতে চান। অর্থাৎ এটি অনেকটা রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির চেষ্টা। যখন একটি শাসনপর্বের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে, তখন তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও দায় ভাগাভাগির বদলে দায় ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন নয়।
তবে এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয় নয়— এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যও বিপজ্জনক। কারণ এর মাধ্যমে একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এমন এক অদৃশ্য বলয়ে নেওয়া হয়েছিল, যার কোনও আনুষ্ঠানিক জবাবদিহি নেই। এটা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করে, প্রকৃত ক্ষমতা থাকে অন্য কোথাও। গণতন্ত্রের জন্য এর চেয়ে ক্ষতিকর বার্তা আর হতে পারে না। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো জবাবদিহি। ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু তার মালিক থাকবে না— এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। সিদ্ধান্তের সময় সবাই ক্ষমতার অংশ হতে চান, কিন্তু সমালোচনার সময় কেউ দায় নিতে চান না— এই সংস্কৃতি একটি গভীর রাজনৈতিক অসুস্থতার লক্ষণ।
রাষ্ট্রীয় সংকট ও সত্য উদ্ঘাটন
বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট এখানেই। এখানে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক আস্থার ভিত্তিতে, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ভিত্তিতে নয়। এর ফলাফল হলো অস্বচ্ছতা, বিভ্রান্তি এবং শেষ পর্যন্ত দায়হীনতা।
দেশবাসীর সামনে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্র আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল? কে কোন সিদ্ধান্তে যুক্ত ছিলেন? কোন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ হয়েছে? কোথায় কোথায় সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল? কারা ছিলেন সেই অদৃশ্য বলয়ের সদস্য? রাষ্ট্রের পক্ষে এবং জনগণের নামে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর প্রকৃত মালিক কারা?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার শুধু নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বার্থেই এগুলোর জবাব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এমন একটি সরকারের ক্ষেত্রে, যারা প্রায় দুই বছর ধরে সংস্কারের মুলা ঝুলিয়ে রেখে জনগণকে অপেক্ষায় রেখেছিল, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রকে ক্রমাগত একটি গোষ্ঠীর পক্ষে এবং আরেকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির আড়ালে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা নিরপেক্ষ ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এই সময়কার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত। কারণ ইতিহাসের কাছে সবচেয়ে বড় সংস্কার হচ্ছে সত্য উদ্ঘাটন, দায় আড়াল করা নয়।
দায় এড়ানোর এই সম্মিলিত প্রতিযোগিতা দিয়ে সেই সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে না। বরং যত বেশি ‘আমি জানতাম না’, ‘আমি সেখানে ছিলাম না’ কিংবা ‘আমাকে ডাকা হতো না’— ধরনের বক্তব্য সামনে আসবে, ততই জনমনে সন্দেহ গভীর হবে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা কোনও দর্শকের ভূমিকা নয়— যারা ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ ছিলেন, যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সুবিধা ভোগ করেছেন, যারা সরকারের মুখপাত্রের মতো জনগণের সামনে সেই নীতিগুলোকে সমর্থন করেছেন, তাদের পক্ষে আজ সম্পূর্ণ নির্দোষ সাজার সুযোগ খুবই সীমিত। ইতিহাসের আদালতে নীরবতাও একটি অবস্থান, আর ক্ষমতার ভেতরে থেকে নীরব থাকা অনেক সময় সক্রিয় সমর্থনেরই আরেক নাম। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের বর্তমান আত্মপক্ষসমর্থন তাই একটি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
তারা সম্ভবত উপলব্ধি করছেন যে, সময় বদলাচ্ছে, রাজনৈতিক আবহাওয়া পরিবর্তিত হচ্ছে এবং যে সিদ্ধান্তগুলো একসময় প্রশ্নাতীত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো এখন কঠোর জনসমালোচনা ও ইতিহাসের বিচারের মুখোমুখি। তাই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরির প্রতিযোগিতা— সবাই ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন, কিন্তু এখন কেউ দায়ের কাছাকাছি থাকতে চান না।
দায় এড়িয়ে নয়, বরং দায় স্বীকারের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব। অন্যথায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দায়হীন ক্ষমতা ও অস্বচ্ছ শাসনের প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তখন ইতিহাসের রায়ে এই সময়কে এমন এক অধ্যায় হিসেবে মনে রাখা হবে, যেখানে ক্ষমতার ভাগ নিতে সবাই আগ্রহী ছিল, কিন্তু জবাবদিহির সময় কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি!
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট



