চট্টগ্রামে জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবাহী গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছে। রোববার রাতে টাইগারপাস এলাকায় করপোরেশনের প্রবেশমুখে এনসিপি নেতাকর্মী ও মেয়রের অনুসারী বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা পালটা বিক্ষোভে মেতে ওঠেন। সোমবার সকালে এনসিপি পুনরায় গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে পুলিশের সাথে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সূত্রপাত
লালখানবাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারগুলোতে জুলাই বিপ্লবের পর নানা ধরনের গ্রাফিতি অঙ্কন করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও স্টেকহোল্ডাররা। কয়েকদিন ধরে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলতে থাকেন এবং কিছু পিলারে 'কন্টাক্ট ফর এডভার্টাইজমেন্ট' ও মোবাইল নম্বর লিখে দেন। করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনের জন্য স্পেস ভাড়া দেওয়াই এর কারণ বলে জানা যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এনসিপি নেতাকর্মীরা।
পালটা বিক্ষোভ ও পুলিশি ব্যবস্থা
রোববার রাতে এনসিপি নেতাকর্মীরা টাইগারপাসে করপোরেশনের প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে মেয়র ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে মেয়রের অনুসারী বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও মহিলা দলের নেতাকর্মীরাও জড়ো হয়ে পাল্টা বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এই পালটা বিক্ষোভ চলে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। সোমবার সকালে এনসিপি আবারও গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জিইসি মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করে।
সংঘর্ষ ও উত্তেজনা
১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এনসিপি নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে রং-ব্রাশ নিয়ে টাইগারপাস এলাকায় জড়ো হন। তারা পিলারে জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে পুলিশ ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এনসিপি নেতাকর্মীরা মহিলা পুলিশের গায়ে রং ছুড়ে মারলে পুলিশও রঙের বালতি কেড়ে নিয়ে তাদের দিকে ছুড়ে মারে। এ সময় এনসিপির এক নারী কর্মী ফুটপাতে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ হ্যান্ডমাইক দিয়ে বারবার সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তারা কর্ণপাত না করায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এনসিপির অভিযোগ
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মাঈনুদ্দিন মেয়রকে 'অবৈধ মেয়র' ও 'জুলাই গাদ্দার' আখ্যা দিয়ে বলেন, 'উনার মেয়াদ চলে গেছে সেটা আমরা জানতাম; কিন্তু উনার ব্রেনের বা মেধার মেয়াদ চলে গেছে সেটা জানতাম না।' তিনি অভিযোগ করেন, মেয়র গ্রাফিতি মুছে দিয়ে বিজ্ঞাপনের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন। এছাড়া তিনি বিপ্লব উদ্যান দখল করে চারতলা মার্কেট নির্মাণের অভিযোগও আনেন। আরিফ মঈনুদ্দিন আরও বলেন, মেয়র হওয়ার পর থেকে নগরে আইনশৃঙ্খলা অবনতি, হত্যাকাণ্ড ও জলাবদ্ধতা বেড়েছে। তিনি মেয়রকে পদত্যাগের আহ্বান জানান।
মেয়রের বক্তব্য
রোববার রাতে ঘটনাস্থলে এসে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর বাসায় ককটেল মারা হয়েছে, অসুস্থ মাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তিনি এনসিপির একটি গোষ্ঠীকে জুলাই আন্দোলন হাইজ্যাক করার চেষ্টার অভিযোগ করেন। মেয়র আরও বলেন, দেয়ালগুলোতে পোস্টার থাকায় গ্রাফিতি ঢাকা পড়েছিল। তিনি আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নান্দনিকভাবে নতুন গ্রাফিতি অঙ্কনের প্রস্তাব দিয়েছেন এবং নিজে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, করপোরেশন থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এনসিপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনকে শহর অশান্ত করার জন্য দায়ী করেন।
পুলিশের অবস্থান
সিএমপির ডিসি (উত্তর) আমিরুল ইসলাম জানান, ১৪৪ ধারা থাকা সত্ত্বেও একটি পক্ষ অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কিছু বাগবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। তিনি সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অনুরোধ জানান এবং বলেন, পুলিশের সতর্কতার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।
এনসিপির সংবাদ সম্মেলন
সোমবার বিকালে ষোলশহর রেলস্টেশনে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। সেখানে মহানগর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোইয়াব ও সদস্য সচিব আরিফ মাঈনুদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে সন্ধ্যা ৭টায় আবারও জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এদিকে সোমবার দুপুরে টাইগারপাস এলাকায় বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল এবং দামপাড়া পুলিশ লাইনের গেটে সোয়াত টিম অবস্থান নেয়। জনমনে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।



