শিল্প ও সংস্কৃতির পরিসর যেকোনও উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণভোমরা। শিল্পীর তুলি, কার্টুনিস্টের রেখা, লেখকের কলম, আলোকচিত্রীর লেন্স কিংবা মঞ্চের ভাষা কেবল নান্দনিকতার চর্চা করে না, বরং তা সমাজের ক্ষমতা-কাঠামোকে প্রশ্ন করে এবং ক্ষমতার সমীকরণকে জনসমক্ষে উন্মোচন করে। কিন্তু সমাজ যখন কর্তৃত্ববাদ বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার খপ্পরে পড়ে, তখন শাসকের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শৈল্পিক পরিসরকে সংকুচিত করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কর্তৃত্ববাদের উত্থান-পতন এবং এর ফলে শিল্পী ও শিল্পের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সবসময়ই এক তীব্র টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে শিল্পের স্বাধীনতা কখনোই স্থায়ী কোনও উপহার হিসেবে আসেনি—এটি সবসময়ই রাজপথের লড়াই এবং রাজনৈতিক ওঠানামার মধ্য দিয়ে অর্জিত এক ভঙ্গুর অধিকার।
শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন ও দমনের চার মন্ত্র
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনকাল এক ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনব্যবস্থায় রূপ নেয়। এই দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে এককেন্দ্রিক করার সমান্তরালে মুক্তচিন্তা, ভিন্নমত এবং শৈল্পিক স্বাধীনতার ওপর নেমে আসে এক অভূতপূর্ব ও কাঠামোগত অবদমন। উন্নয়নের আড়ালে স্বৈরাচারী মনস্তত্ত্ব কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীন শিল্পচর্চাকে পঙ্গু করেছিল এবং শিল্পীদের স্ব-সেন্সরশিপের দিকে ঠেলে দিয়েছিল—তা একটি গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। শেখ হাসিনার আমলে শিল্প ও শৈল্পিক স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণে মূলত চারটি মন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে: আইনি শৃঙ্খল ও ভয়ের সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ ও প্রচারযন্ত্রে রূপান্তর, মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও স্ব-সেন্সরশিপ (বিশেষ করে চলচ্চিত্র ও দৃশ্যশিল্পের ওপর অদৃশ্য সেন্সরশিপ), এবং পাঁচ অনুগত বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী শ্রেণি তৈরি।
১. আইনি শৃঙ্খল ও ভয়ের সংস্কৃতি
শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে শিল্পী, সংস্কৃতি ও শৈল্পিক স্বাধীনতা হরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল আইনকে একটি নিপীড়নমূলক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। ২০১৮ সালে প্রণীত বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে আনা ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ ছিল মুক্তচিন্তা এবং শিল্পী ও শিল্পের পরিসরের ওপর বড় আইনি আঘাত। এই আইনের অধীনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরকারের নীতি, দুর্নীতি বা শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে কোনও ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন, কবিতা বা গান প্রকাশ করলেই ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ বা ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’র অভিযোগে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার ও জামিনহীন কারাভোগের বিধান রাখা হয়।
২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরায় সরকারের দমনপীড়নের সমালোচনা করে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরপরই প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে তাঁর বাসা থেকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়। বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের পর তিনি মুক্তি পেলেও এটি দেশের স্বাধীন সংস্কৃতিকর্মীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বরাও এই শাসনব্যবস্থায় নিরাপদ নন।
কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদের মতো ব্যক্তিদের এই নিপীড়নমূলক আইনের অধীনে কারাবরণ করতে হয়, যেখানে জেল হেফাজতে থাকা অবস্থায় মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কার্টুনিস্ট কিশোরের কারাবরণ ও নির্যাতন চারুশিল্প ও ব্যঙ্গচিত্রের জগতে এক তীব্র ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, যার ফলে কতজন প্রথিতযশা শিল্পী তাঁদের তুলি থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, তা আমরা এখনও জানি না। একজন লেখকের কাস্টডিতে মৃত্যু এবং কার্টুনিস্টের ওপর নির্যাতন সমগ্র দৃশ্যশিল্প ও কার্টুন জগতের জন্য একটি চূড়ান্ত ভয়ের বার্তা তৈরি করেছিল। এছাড়া, রিতা দেওয়ান এবং শরীয়ত বয়াতি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এমন দুই ভুক্তভোগী চরিত্র, যাঁদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে—আইনিশৃঙ্খল, অসহিষ্ণু সমাজ এবং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা কীভাবে একটি দেশের মুক্ত শৈল্পিক পরিসরকে সংকুচিত ও পঙ্গু করে দিতে পারে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ ও প্রচারযন্ত্রে রূপান্তর
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন শিল্পচর্চার উন্মুক্ত জায়গা থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণভাবে শাসক দলের প্রচারযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির একচ্ছত্র দলীয়করণ। লিয়াকত আলী লাকীর একটানা প্রায় একযুগেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ মহাপরিচালকত্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি কার্যত আওয়ামী লীগের একটি অঙ্গসংগঠনের মতো কাজ করেছে। অ্যাকাডেমির প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর স্তুতিবাচক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক এজেন্ডাভিত্তিক প্রদর্শনীর আয়োজন এবং দলীয় ধারার নাটকের পৃষ্ঠপোষকতা করা। যেসব শিল্পী, নাট্যদল বা নির্দেশক সরাসরি সরকারের বন্দনা বা তোষামোদি করতেন না, তাঁরা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মিলনায়তন বা অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে অলিখিত বর্জনের শিকার হতেন। ভিন্নমতাবলম্বী বা নিরপেক্ষ নির্দেশকদের সমসাময়িক বাস্তবধর্মী নাটক বা প্রদর্শনীর জন্য হল বরাদ্দ দিতে নানা আমলাতান্ত্রিক উসিলায় অস্বীকৃতি জানানো হতো।
৩. চলচ্চিত্র ও দৃশ্যশিল্পের ওপর অদৃশ্য সেন্সরশিপ
চলচ্চিত্র এবং দৃশ্যশিল্পের মতো শক্তিশালী মাধ্যমগুলোকে শেখ হাসিনার সরকার কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখেছিল। চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে ব্যবহার করা হতো একটি রাজনৈতিক ছাঁকনি হিসেবে। সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার সমালোচনা, পার্বত্য অঞ্চলের জাতিগত সংঘাত, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা গুম-খুনের মতো বাস্তব ঘটনা নিয়ে নির্মিত যেকোনও চলচ্চিত্র বা প্রামাণ্যচিত্রকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দিয়ে বছরের পর বছর আটকে রাখা বা নিষিদ্ধ করা হতো। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ চলচ্চিত্রের দীর্ঘদিনের সেন্সর জটিলতা এর অন্যতম উদাহরণ। মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের শিকার পরিবারের কান্না নিয়ে তৈরি আলোকচিত্র প্রদর্শনী বা আর্ট শো-গুলোকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে প্রদর্শনী শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়ার অসংখ্য নজির এই শাসনামলে তৈরি হয়। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি নিয়ে নজরুল ইসলাম খানের তৈরি চলচ্চিত্র ‘রানা প্লাজা’কে আদালতের নির্দেশ এবং সেন্সর বোর্ডের বাধায় আলোর মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি। সরকারের ধারণা ছিল, এই সিনেমা আন্তর্জাতিকভাবে ‘দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করবে। ফলে নির্মাতারা সমসাময়িক বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক ট্র্যাজেডি নিয়ে কাজ করাই বন্ধ করে দেন।
৪. মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও স্ব-সেন্সরশিপ
কর্তৃত্ববাদের সবচেয়ে বড় কুফল হলো এটি সরাসরি শিল্পীর মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অতি-নজরদারি এবং বিরোধী মতের ওপর কঠোর দমনের ফলে শিল্পকুলে এক ধরনের প্রতিরোধমূলক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। শিল্পকারীরা জানতেন যে একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে গিয়ে কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক সত্য প্রকাশ করলে ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়া থেকে শুরু করে গুম বা কারাবরণের ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে দৃশ্যত কোনও প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই শিল্পীরা নিজের সৃষ্টিকে নিজেই ফিল্টার বা অবদমন করতে শুরু করেন, যাকে বলা হয় ‘স্ব-সেন্সরশিপ’। এই স্ব-সেন্সরশিপের কারণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মূলধারার শিল্প ও সাহিত্যে এক ধরনের বন্ধ্যত্ব বা বৈচিত্র্যহীনতা দেখা দেয়।
৫. অনুগত বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীশ্রেণি তৈরি
কর্তৃত্ববাদের স্থায়িত্ব ও সামাজিক বৈধতা নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনা সরকার এক ধরণের ‘সাংস্কৃতিক অনুগত গোষ্ঠী’ তৈরি করেছিল। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, পদক ও সুযোগ-সুবিধাকে মেধার পরিবর্তে সম্পূর্ণ দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক কিংবা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজনৈতিক তোষামোদি। সরকারের অন্ধ অনুগত বহু শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীকে ঢাকার পূর্বাচল বা রাজউকের ভিআইপি প্লট, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ট্রাস্ট-বোর্ডের সদস্যপদ এবং মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো।
২০১৮ ও ২০২৪ সালের একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের আগে চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত জগতের একদল তারকা শিল্পীকে নিয়ে দেশজুড়ে সরকারি প্রচারণার বহর নামানো হয়েছিল। এই শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীটি সরকারের গুম, খুন, ‘ভোট ডাকাতি’ এবং সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে তো টু-শব্দ করেনইনি, বরং প্রতিটি ফোরামে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ ও ‘নেত্রীর দূরদর্শিতা’র সাফাই গেয়ে গেছেন। ‘আলো আসবেই’ গ্রুপ কেলেঙ্কারি এর বড় প্রমাণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও এই অনুগত প্রবীণ ও সমসাময়িক শিল্পীদের একটি বড় অংশ ‘আলো আসবেই’ নামে একটি গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর ও সহিংস অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এটি জনগণের সামনে উন্মোচিত হয় এবং এই অনুগত শ্রেণির ফ্যাসিবাদের দোসর রূপটি জনসমক্ষে উন্মোচন করে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের জটিল সমীকরণ
শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদ শিল্পের পরিসরকে যতটা চেপে ধরেছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ তরুণ শিল্পীদের মাধ্যমে রাজপথে রূপ নেয়। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর্বে বাংলাদেশে শিল্পী, শিল্পকলা এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিসরের স্বাধীনতা এক জটিল ও বহুমাত্রিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর আপাতদৃষ্টিতে মতপ্রকাশের অবারিত সুযোগ তৈরি হলেও কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক স্তরে শিল্পচর্চার স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইটি এখনো শেষ হয়নি। স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলন চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার দেয়ালগুলো হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ক্যানভাস। তরুণ শিল্পীরা দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনের দমনপীড়ন, গুম এবং হত্যার নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন। প্রতিবাদী গান, হিপ-হপ ও র্যাপ মিউজিকের মাধ্যমে তরুণ সংগীতশিল্পীরা সরাসরি স্বৈরাচারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সুর তোলেন—যা ডিজিটাল সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন ধরনের অবদমন
প্রাথমিক পর্যায়ে রাজপথে গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদী গানের জোয়ার দেখা গেলেও, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের শিল্প ও শৈল্পিক স্বাধীনতার পরিসরে এক নতুন ধরনের সংকট ও অবদমন তৈরি হয়েছে। এই পর্বে রাষ্ট্রীয় বা আইনি শৃঙ্খলের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অনানুষ্ঠানিক সেন্সরশিপ’ এবং ‘মব কালচার’ বা উগ্র জনতার শাসন। রাষ্ট্র বা সরকার অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি না করলেও, উগ্রপন্থি বা রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর হুমকি, আক্রমণ এবং মব জাস্টিসের মুখে শিল্পীদের নিরাপত্তা দিতে বা শৈল্পিক পরিসর রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে শিল্প ও শৈল্পিক স্বাধীনতার চর্চা হরণ এবং সংকুচিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত উদাহরণগুলো বিস্তর।
ক. থিয়েটার ও মঞ্চনাটকে আঘাত
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নজিরবিহীন ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ঢাকার শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে, যেখানে মঞ্চনাটক প্রদর্শনী চলাকালীন মবের হুমকির মুখে নাটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিল্পকলা অ্যাকাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় থিয়েটার দল ‘দেশ নাটক’ তাদের জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘নিত্যপুরাণ’ মঞ্চস্থ করছিল। নাটক চলাকালীন বাইরে একদল বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে নাট্যদলের প্রধান এবং নাটকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু এবং ভেতরে ভাঙচুরের চেষ্টা করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দর্শকদের নিরাপত্তা এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক নাটকটি মাঝপথে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। রাষ্ট্রীয় একটি প্রধান সাংস্কৃতিককেন্দ্রে নাটক মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার এই ঘটনাটি থিয়েটারকর্মীদের শৈল্পিক স্বাধীনতায় চরম আঘাত হানে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় উগ্র রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর আপত্তির মুখে অনেক ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা এবং মঞ্চনাটকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ‘সংস্কৃতি ও বিনোদন ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থি’—এমন ধোঁয়া তুলে স্থানীয় প্রশাসন মবের আশঙ্কায় অনেক জায়গাতেই অলিখিতভাবে নাট্যচর্চা সংকুচিত করে ফেলেছে।
খ. কনসার্ট ও সংগীত উৎসবে হস্তক্ষেপ
সংগীতের জগতে, বিশেষ করে রক কনসার্ট এবং লোকসংগীতের উৎসবগুলোতে মৌলবাদী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর সরাসরি হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকার হাতিরঝিলের অ্যাম্পিথিয়েটারে কেবল নারী সংগীতশিল্পীদের নিয়ে ‘উইমেন ইন রক’ নামক একটি কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু একদল উগ্রপন্থি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সরাসরি ভেন্যুতে গিয়ে কনসার্টের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দেয় এবং নারী শিল্পীদের পারফর্ম করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তার অভাব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় আয়োজকরা শেষ মুহূর্তে কনসার্টটি স্থগিত করতে বাধ্য হন।
একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জনপরিসরে আয়োজিত শরৎ উৎসব বা বর্ষবরণ সংক্রান্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে উগ্রপন্থি শিক্ষার্থীরা ‘সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি’ ছড়ানোর অভিযোগ এনে বাধা দেয়। ফলে অনেক অনুষ্ঠান বাতিল বা অত্যন্ত গোপনে ঘরোয়া পরিবেশে করতে হয়েছে।
গ. বাউল ও সুফি সংস্কৃতির ওপর পদ্ধতিগত আঘাত
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের হাজার বছরের লোকায়ত বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি বাউল ও সুফি সংস্কৃতির ওপর উগ্র মৌলবাদী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক আঘাত নেমে আসে। এই রূপান্তরকালীন পর্বে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির মাজার ছাড়াও সিলেট, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য সুফি মাজার, খানকাহ এবং বাউলদের আস্তানায় সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের অক্টোবরে লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী স্মরণোৎসবে উগ্রপন্থিরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠ দখল করে গান-বাজনাকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের আলটিমেটাম দেয় এবং বাউলদের একতারা ভেঙে ফেলাসহ তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করে। গ্রামীণ মেলা, ওরস ও পালাগানের আসরগুলোতে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের’ অলিখিত ধুয়ো তুলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মবের আশঙ্কায় বাউলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে উল্টো অনুষ্ঠান ও গান-বাজনা বন্ধের নির্দেশ দেয়। ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতা, পদ্ধতিগত সামাজিক বর্জন এবং আইনি সুরক্ষার অভাবে বাউল ও সুফি সাধকেরা গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও স্ব-সেন্সরশিপের মধ্যে পতিত হন, যা নতুন বাংলাদেশের স্বাধীন শৈল্পিক ও আধ্যাত্মিক পরিসরকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ঘ. চারুকলা ও দৃশ্যশিল্পের অবদমন
দৃশ্যশিল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়—উভয় ধরনের অন্ধত্ব শৈল্পিক প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করেছে। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে সারা দেশে কেবল রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভাস্কর্যই নয়, বরং বহু অরাজনৈতিক, নান্দনিক এবং প্রগতিশীল ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে এবং বিভিন্ন মোড়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মগুলো উগ্র মবের আক্রোশের শিকার হয়। গ্যালারিগুলোতে এমন কোনও ছবি বা আলোকচিত্র প্রদর্শন করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে—যা সমসাময়িক কোনও ধর্মীয় বা স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয়কে স্পর্শ করে। উগ্র জনতার আক্রমণের ভয়ে গ্যালারি মালিক এবং চারুশিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের কাজকে সেন্সর করছেন।
ঙ. সার্টিফিকেশন বোর্ডের সীমাবদ্ধতা ও নতুন ভয়
যদিও অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী আমলের বিতর্কিত ‘চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড’ ভেঙে আধুনিক ‘সার্টিফিকেশন বোর্ড’ গঠন করেছে, তবু চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য ভয় কাজ করছে। বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি বা ফ্যাসিবাদের সমালোচনা করা সহজ হলেও বর্তমান সময়ে সমাজের কোনও রক্ষণশীল নিয়ম বা উগ্র মানসিকতার সমালোচনা করে সিনেমা বানানোর সাহস নির্মাতারা পাচ্ছেন না। সাইবার নিরাপত্তা আইন বা অন্যান্য নিপীড়নমূলক আইনের ধারাগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত না হওয়ায় এবং মব কালচারের আইনি বিচার না হওয়ায় চলচ্চিত্রকাররা গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবদমন বা ভয়ের মধ্যে রয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তর্নিহিত সংকট
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্পী ও শৈল্পিক স্বাধীনতা হরণের ধরনটি বিগত সরকারের চেয়ে ভিন্ন। আগে শিল্পীরা ভয় পেতেন রাষ্ট্রীয় সংস্থা, পুলিশ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে—আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিল্পীরা ভয় পাচ্ছেন রাজপথের উগ্র মব বা জনতাকে। উগ্র গোষ্ঠীগুলো যখন কোনও শিল্পীর অধিকার হরণ করেছে, রাষ্ট্র বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অনেক সময় তাদের গ্রেফতার বা দমন করার পরিবর্তে ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধের’ অজুহাতে শিল্পীর অনুষ্ঠান বা সৃষ্টিকেই বন্ধ করে দিয়েছে—যা এক ধরনের নেতিবাচক আত্মসমর্পণ।
বর্তমানে, বাংলাদেশে শিল্পী ও শিল্পের পরিসরের স্বাধীনতা একটি জটিল এবং রূপান্তরকালীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় আইনি শৃঙ্খল, প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ, দৃশ্য ও চলচ্চিত্র শিল্পের ওপর অদৃশ্য নজরদারি এবং পুরস্কার-প্লটের বিনিময়ে অনুগত তোষামোদকারী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে শৈল্পিক স্বাধীনতাকে সুপরিকল্পিতভাবে অবদমিত করা হয়েছিল। সেই স্বৈরাচারী লোহার খাঁচার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের গ্রাফিতি, দেয়ালচিত্র আর দ্রোহের গান অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো—রাজনৈতিক স্বৈরাচারের পতন ঘটলেই রাতারাতি একটি সমাজ মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে ওঠে না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অবসান ঘটলেও শিল্পের পরিসর এখন এক নতুন ও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি—যার নাম ‘অনানুষ্ঠানিক সেন্সরশিপ’ ও ‘মব কালচার’। শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে নাটক বন্ধ করে দেওয়া, নারী শিল্পীদের কনসার্ট পণ্ড করা, প্রগতিশীল ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল ও সুফি সংস্কৃতির ওপর সুপরিকল্পিত মৌলবাদী আঘাত এরই অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। পূর্বের রাষ্ট্রীয় ভয়ের স্থান এখন দখল করেছে রাজপথের উগ্র জনতার ভয়। আর এই মবের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পিছু হটা বা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া প্রকারান্তরে এক ধরনের নেতিবাচক আত্মসমর্পণ, যা শিল্পীদের পুনরায় এক নতুন ‘স্ব-সেন্সরশিপ’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সুতরাং, নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তখনই সফল হবে, যখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদেরও সমূলে বিনাশ ঘটবে। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এখন প্রধানতম হলো—বিগত আমলের নিপীড়নমূলক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা এবং একইসঙ্গে রাজপথের মব জাস্টিসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রাষ্ট্রকে কেবল পরোক্ষভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ দিলেই চলবে না, বরং নাগরিকদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চর্চার অধিকারকে কঠোর শারীরিক ও আইনি সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যতক্ষণ না একটি প্রগতিশীল, সহনশীল ও বহুত্ববাদী পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে, যেখানে কোনও শিল্পী বা বাউলকে ক্ষমতার কিংবা উগ্র মবের ভয়ে নিজের সৃষ্টিকে অবদমন করতে হবে না—ততক্ষণ পর্যন্ত একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা এবং শিল্পের আসল মুক্তি অধরাই থেকে যাবে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী



