পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কৌশলগত পরিবর্তন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মূল লড়াই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মইদুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিজেপি এবার 'ভুল করছে একটু কম', যা তাদের প্রচারকৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এক যুগ ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এই দলটি পশ্চিমবঙ্গ দখলের জন্য গোছালো তৎপরতা চালাচ্ছে, কিন্তু প্রাক্নির্বাচনী জনমত জরিপে তৃণমূল কংগ্রেসকেই এগিয়ে রাখছে বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনের তারিখ ও গুরুত্ব
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হবে এবং ফলাফল ঘোষিত হবে ৪ মে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য যেকোনো দলের ১৪৮টি আসন জয় অপরিহার্য। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ২১৫টি আসনে জয়ী হয়েছিল, বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিজেপির কৌশল পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিজেপির নতুন কৌশল কী?
অধ্যাপক মইদুল ইসলামের মতে, বিজেপি এবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আগে থেকেই মোতায়েন করছে। জাতীয় নিরাপত্তার অনুপ্রবেশ ন্যারেটিভ ব্যবহারের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের কৌশলও কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ফারাক তৈরির চেষ্টা করেছেন, যা একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মোদির ভূমিকা হ্রাস
২০২১ সালের নির্বাচনে মোদি পশ্চিমবঙ্গে ২০টির বেশি সমাবেশ করেছিলেন, কিন্তু এবার তা সীমিত রাখা হয়েছে। বিজেপির এক নেতার মতে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন মাথায় রেখে রাজ্যগুলোতে মোদিনির্ভরতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তৃণমূলপন্থী বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করেন, মোদির ক্যারিশমা হ্রাস পাওয়াই এর আসল কারণ।
আরএসএসের সম্পৃক্ততা
এবারের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নেতা সুনীল বনসলকে কৌশল ও পরিকল্পনার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। সংঘের অর্থনীতি শাখার ধনপত আগরওয়াল জানান, বিজেপি প্রচারকাজ অনেক গুছিয়ে করতে পারছে কারণ বনসল পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছেন। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই, এমন ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অমিত শাহের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবার ১৫ দিন ধরে রাজ্যে অবস্থান করছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা গোয়েন্দা সংস্থা ও কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনী নির্বাচনী তল্লাশি চালাচ্ছে তৃণমূল নেতাদের বাড়িতে। মুসলমান প্রধান এলাকাগুলোতে বেশি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হচ্ছে, যা মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় কর্মীরা।
তৃণমূলের শক্তি ও চ্যালেঞ্জ
জনমত জরিপে তৃণমূল এগিয়ে থাকার প্রধান কারণ হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অব্যাহত জনপ্রিয়তা। বিজেপির পক্ষে তাঁর বিকল্প হিসেবে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। এছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের ৮০ হাজারের বেশি নির্বাচনী বুথে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকাও বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বিজেপি এবার ৮০টি মুসলমান প্রধান আসনে লড়াই না করে বাকি ২১৫টি আসনে শক্তি কেন্দ্রীভূত করার কৌশল নিয়েছে।
ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তা বেড়ে ১০ শতাংশ হয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এটি কমে ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। বিজেপির জয় যেন আসি আসি করেও আসছে না, যা তাদের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছে।
সর্বোপরি, প্রচার ও পরিকল্পনায় গুছালো হওয়া সত্ত্বেও বিজেপিকে এখনো তৃণমূলের চেয়ে পিছিয়ে রাখছে অধিকাংশ জরিপ। নির্বাচনের ফলাফলই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে, কে জয়ী হয় এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গনে।



