ভারতে ২৭ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও অনিশ্চয়তা
ভারতে ২৭ লাখ ভোটার বাদ, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশেও অনিশ্চয়তা

ভারতে ২৭ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও অনিশ্চয়তা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৭ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যা ভোটাধিকার নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই তালিকায় বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ষাটোর্ধ্ব কমল রায় ও তাঁর পরিবার, যাঁরা ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ছিটমহল থেকে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। কমল রায় অতীতে ভোট দিলেও এবার তিনি, তাঁর স্ত্রী রূপা রায় এবং পুত্রবধূ অনামিকা রায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, কেবল তাঁর ছেলের নাম রয়েছে।

ভোটার তালিকা সংশোধনে বিশৃঙ্খলা

এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রথমে প্রায় ৯২ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়, যাঁদের অনেকে রাজ্য ছেড়ে গেছেন বা মারা গেছেন বলে দাবি করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ২৭ লাখ মানুষের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষক সাবির আহমেদ উল্লেখ করেন যে, সময়সীমা অত্যন্ত কম এবং আইনি বিধির অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, "এসআইআর-বিষয়ক একটি সার্বজনীন নিয়মের প্রয়োজন ছিল, যা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। অনেক নতুন নিয়ম আমদানি করা হয়েছে, যার কোনো বিধি নেই।"

উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদেরও নাম বাদ

কেবল নিম্নবিত্ত নন, পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক নন্দিতা রায়ও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। নন্দিতা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় তাঁর নাম ছিল, কিন্তু এসআইআরের পর তাঁর নাম 'বিচারাধীন' বিভাগে রাখা হয় এবং পরে মুছে ফেলা হয়। তিনি বলেন, "এটি কেবল একটি ভোটের বিষয় নয়, এটি সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের প্রশ্ন।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও ট্রাইব্যুনালের জটিলতা

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, যারা বাদ পড়া ভোটারদের আবেদন খতিয়ে দেখছেন। কোর্ট জানিয়েছে, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ছাড়পত্র পাওয়া ব্যক্তিরা প্রথম দফার নির্বাচনে (২৩ এপ্রিল) ভোট দিতে পারবেন। তবে তৃণমূলের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালের ভবনে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ এবং কোনো শুনানি হয়নি। এছাড়া, ট্রাইব্যুনালের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়ার এখনো প্রকাশ করা হয়নি, ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত।

রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষণ

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এসআইআরে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মানুষ বেশি বাদ পড়েছেন। রাজনীতি বিশ্লেষক সুমন ভট্টাচার্য বলেন, "বিজেপি ১০০ আসন পেরিয়ে যেতে পারে—এই সমীকরণে এসআইআরের প্রভাব রয়েছে। তবে বাঙালির মনে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় এটি বিজেপির জন্য বুমেরাং হতে পারে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৃণমূলের ভোটব্যাংক মুসলমান ও মহিলা গোষ্ঠী কম গুরুত্ব পেয়েছে, যা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও ভাষাগত সমস্যা

গবেষক সাবির আহমেদ উল্লেখ করেন, এসআইআরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে, যা জটিলতা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, "বাংলা নামের বানান সম্পর্কে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ধারণা নেই, ফলে আবদুর জব্বার হয়ে গেছেন আ. জব্বার, যা বাদ পড়ার কারণ হয়েছে।" এছাড়া, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি থাকার দাবি প্রথম তালিকায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভোটাধিকারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বাদ পড়া ২৭ লাখ ভোটারের ভোটাধিকার এখনো অনিশ্চিত। ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া জটিল এবং সময় সীমিত হওয়ায় অনেকেই ভোট দিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কমল রায়ের মতো ব্যক্তিরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন ফোন করে জিজ্ঞাসা করছেন, "আমাদের কী হবে?" কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মিলেনি।