১৫ বছর পর পুলিশ চাকরি ফিরে পেলেন কোহিনূর মিয়া, প্রশাসনে বিতর্কের ঝড়
১৫ বছর পর পুলিশ চাকরি ফিরে পেলেন কোহিনূর মিয়া

দীর্ঘ ১৫ বছর পর পুলিশ চাকরিতে ফিরলেন কোহিনূর মিয়া

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ব্যাপক আলোচিত ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়া দীর্ঘ পনেরো বছর পর আবারও পুলিশ বাহিনীর চাকরি ফিরে পেয়েছেন। সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনে আগের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে তাকে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহাল করা হয়েছে। এই ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিতর্কিত ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

কোহিনূর মিয়া বিসিএস ১২ ব্যাচের একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনায় আসেন। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার ও ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০২ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে গভীর রাতে পুলিশি অভিযানের ঘটনায় তিনি বিশেষভাবে আলোচিত হন, যার ফলে তৎকালীন উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

বিএনপি সরকারের সময়েই তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যদিও তিনি সেসব থেকে খালাস পেয়েছেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালের অক্টোবরে তাকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি প্রকাশ্যে দেখা যাননি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সমালোচনা

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা কোহিনূর মিয়ার চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, "চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কৃত করার জন্য ব্যবহৃত হলে এটা খারাপ নজির তৈরি করবে। এগুলোর মাধ্যমে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও ভালো প্রশাসন আর কখনোই হবে না।"

বিশেষজ্ঞদের যুক্তি হলো, যারা অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দিয়ে ভিন্নভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে কাজে সম্পৃক্ত না থাকা ব্যক্তিদের সরাসরি একই পেশায় ফিরিয়ে আনা কর্মরতদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রাসঙ্গিকতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে 'মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণের' প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি এবং কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয় সেটা নিশ্চিত করা হবে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন যে কোহিনূর মিয়ার পুনর্বহাল কি প্রকৃতপক্ষে মেরিটভিত্তিক নাকি রাজনৈতিক বিবেচনার ফল।

প্রশাসনে দীর্ঘ বিরতির চ্যালেঞ্জ

চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে আসার ক্ষেত্রে কোহিনূর মিয়াই একমাত্র উদাহরণ নন। সচিবালয়ে প্রচলিত আছে যে অবসরের পর দীর্ঘ বিরতিতে যাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তারা বর্তমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি।

ফিরোজ মিয়ার মতে, "দশ বছর আগের প্রশাসন আর এখনকার প্রশাসন তো এক না। খুব দক্ষ ছাড়া কাউকে চুক্তিভিত্তিতে আনা হলে তারা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বোঝা হবে এবং এদের কারণে প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা থাকে।"

এই ঘটনা প্রশাসনিক পুনর্বহাল নীতির উপর নতুন করে বিতর্কের সূচনা করেছে এবং আমলাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গঠনে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।