পুলিশের ইউনিফর্ম বিতর্ক: ৯৬% সদস্য পুরোনো পোশাকের পক্ষে, মানসিক পরিবর্তনে জোর সরকারের
পুলিশের ইউনিফর্ম বিতর্ক: ৯৬% পুরোনো পোশাক চান

পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক সমর্থন: পুরোনো ইউনিফর্মের পক্ষে ৯৬ শতাংশ মত

দেশে আনুমানিক দুই লাখের বেশি পুলিশ সদস্যের মধ্যে একটি বড় অংশ তাদের ইউনিফর্ম নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। পুলিশ সদর দফতরের সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশই পুরোনো পোশাক পুনর্বহালের পক্ষে মত দিয়েছেন। পোশাক পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে একটি চিঠির মাধ্যমে দেশের সব পুলিশ সদস্যের কাছে মতামত চাওয়া হলে বিপুল সংখ্যক সদস্য আগের ইউনিফর্মের পক্ষেই স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল: সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় পুরোনোর পক্ষে

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মতে, গত ১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দফতর থেকে ডিআইজি (কন্ট্রোলিং) মো. কামরুল ইসলামের সই করা চিঠিতে জেলাভিত্তিক কল্যাণ সভা আয়োজন করে পোশাক বিষয়ে মতামত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে মোট ১,০৮,৬৪১ জন পুলিশ সদস্য তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করেন। এর মধ্যে নতুন পোশাকের পক্ষে মত দেন মাত্র ৯১১ জন, অন্য কোনও পোশাকের পক্ষে ২,৮১৭ জন এবং পুরোনো পোশাকের পক্ষে মত দেন ১,০৪,৯১৩ জন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ পুলিশ সদস্য তাদের ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্মেই ফিরে যেতে চান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: পোশাক নয়, মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি

নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। বুধবার (৪ মার্চ) সকালে ডিএমপি সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে মানসিক পরিবর্তনে জোর দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, "দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। শুধু পোশাক বদলালে মানসিকতার পরিবর্তন হয় না। তাই এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশ সদর দফতরের অবস্থান: সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, "পুলিশের পোশাক নির্ধারণের এখতিয়ার সরকারের। বর্তমানে পুলিশের পোশাক নিয়ে যে মতামত জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পোশাক পুলিশের জন্য উপযোগী ও মানানসই।" এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, পুলিশ প্রশাসন সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, বরং সরকারের নির্দেশনাই চূড়ান্ত হবে।

জেলাভিত্তিক কল্যাণ সভায় ব্যাপক সমর্থন

পুলিশ সদর দফতর থেকে নতুন পোশাকের রঙ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর পর জেলায় জেলায় পুলিশের বিশেষ কল্যাণ সভা ডাকা হয়। সম্প্রতি নরসিংদী জেলা পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কল্যাণ সভায় উপস্থিত অধিকাংশ পুলিশ কর্মকর্তা পুনরায় পুরোনো পোশাক পরিধানের পক্ষে মত দেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত জেলাভিত্তিক কল্যাণ সভাগুলোতেও একই মতামত পাওয়া গেছে। এসব কল্যাণ সভার প্রধান হিসেবে জেলা পুলিশ সুপাররা নিয়ম মেনে পুলিশ সদর দফতরে পুরোনো পোশাকের পক্ষে মতামতের ফলাফল পাঠান।

নরসিংদীর বিশেষ কল্যাণ সভায় উপস্থিত থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "পুলিশের পোশাক বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়— এটি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক। ব্যবহারিক মান, নকশা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় পুরোনো পোশাকই সময়োপযোগী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।" পুলিশের কল্যাণ সভায় একে একে সব কর্মকর্তা আগের পোশাকের পক্ষেই মতামত প্রকাশ করেন, যা তাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে তুলে ধরে।

নতুন পোশাকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ

অন্যদিকে একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৪০ শতাংশ পুলিশ সদস্য নতুন পোশাক পরিধান করতে পেরেছিলেন। শুরু থেকেই পরিচয় গোপন রেখে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নতুন পোশাকের রঙের বিপক্ষে গণমাধ্যমে মত প্রকাশ করেন। তৎকালীন সময় নতুন পোশাকের রঙ দেখে পুলিশ সদস্যরা এমনও মন্তব্য করেন, নতুন পোশাকের রঙ আসলে রুচির দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছবি। তৎকালীন সময়ে ১০০ জন পুলিশ সদস্যের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৯৫ জন নতুন পোশাক পরতে একেবারেই আগ্রহী নন ও ৫ শতাংশ সদস্য মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

প্রথমে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতে নতুন পোশাক সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে রেলওয়ে পুলিশ, শিল্প পুলিশ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে পোশাক পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, যা এই উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।

গ্রীষ্মকালীন পুরোনো ইউনিফর্মেই ফিরছে পুলিশ

সূত্র জানায়, ১৬ মার্চ থেকে গ্রীষ্মকালীন পোশাক (হাফ হাতা ইউনিফর্ম) পরিধানের নিয়ম থাকলেও নতুন পুলিশের পোশাকের কোনও বরাদ্দ বা সরবরাহ এখনও নেই। ফলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে পুলিশ সদস্যরা পুরোনো হাফ হাতা পোশাকেই দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নতুন পোশাক বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইতিহাস ও পটভূমি: পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের অংশ হিসেবে পোশাক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পুলিশের জন্য আয়রন রঙ, র‍্যাবের জন্য অলিভ রঙ এবং আনসারের জন্য গোল্ডেন হোয়াইট রঙ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পুলিশের লোগোতেও পরিবর্তন আনা হয়। নৌকার পরিবর্তে যুক্ত করা হয় শাপলা, ধান ও গমের শীষ। তবে সূত্র জানায়, পুলিশের লোগো পরিবর্তনের পক্ষে শতভাগ সমর্থন থাকলেও নতুন পোশাকের বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন বেশিরভাগ পুলিশ সদস্য, যা তাদের পছন্দের স্পষ্ট বিভাজন নির্দেশ করে।

এই পুরো বিতর্কটি পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সরকারের নীতিনির্ধারণের মধ্যে একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া তুলে ধরছে। এখন দেখা যাক, সংখ্যাগরিষ্ঠ পুলিশ সদস্যের মতামত এবং সরকারের মানসিক পরিবর্তনের অগ্রাধিকারের মধ্যে কোনটি চূড়ান্তভাবে প্রাধান্য পায়।