আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। র্যাব কি বিলুপ্ত হবে, নাকি পুনর্গঠন করা হবে—এই প্রশ্ন এখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপ থাকলেও র্যাব বিলুপ্ত না করেও কাঠামোগত সংস্কার বা পুনর্গঠন সম্ভব। তবে সরকার যে সেই পথে স্পষ্টভাবে এগোচ্ছে, এমন কোনও ইঙ্গিত নেই।
নতুন যানবাহন কেনা ও বিতর্ক
সম্প্রতি র্যাবের জন্য নতুন যানবাহন কেনায় সরকারি বরাদ্দ অনুমোদনের পর প্রশ্ন উঠেছে—র্যাব কি সত্যিই বিলুপ্তির পথে, নাকি নীরবে পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে? একইসঙ্গে আলোচনায় এসেছে সংস্থাটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ কী? এ পর্যন্ত সরকারিভাবে র্যাব বিলুপ্তির কোনও ঘোষণা নেই। বরং নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত র্যাবের সম্ভাব্য কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি ক্রয় পরিকল্পনায় র্যাবের জন্য নতুন অপারেশনাল যানবাহন সংযোজনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। যদিও র্যাবের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশে একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, পুনর্গঠনের মাধ্যমে গুম ও ক্রসফায়ারের মতো বিতর্কিত অধ্যায় থেকে র্যাবকে বের করে আনা সম্ভব। কর্মকর্তারা আরও বলেন, র্যাব মূলত পুলিশের অধীন একটি ব্যাটালিয়নধর্মী বিশেষায়িত ইউনিট।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও পটভূমি
বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ করে আসেনি। অন্তত এক দশকের বেশি সময় ধরে জমে ওঠা অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ধারাবাহিকতার ফল হিসেবেই এটি এসেছে।
২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাহিনীটিকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পরপরই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বাড়তে থাকে এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরদারি জোরদার হয়।
বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার হয়ে ওঠে। ওই সময়ে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়ায়। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ একাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। একইসঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টেও র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ফলে দেশি ও আন্তর্জাতিক পরিসরে র্যাবের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে সতর্কবার্তা পেতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকরা ঢাকা সফরে এলে র্যাবের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগে মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়ে জোর দেন। নিরাপত্তা সংলাপ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতেও বিষয়টি নিয়মিত আলোচ্য ইস্যুতে পরিণত হয়।
সবশেষে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময়ের সরকার এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে দাবি করে, অভিযোগগুলো বাস্তবতার প্রতিফলন নয় এবং সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে র্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখা হয় এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি বাড়ানো ও আচরণগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
বর্তমান সরকারের অবস্থান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার র্যাব বিলুপ্তির পথে না গিয়ে বরং বাহিনীটিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ নেয়। দৃশ্যমান অভিযান কমিয়ে পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে যৌথ অপারেশন বাড়ানো হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও অনেকটা একই নীতি অনুসরণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একাধিকবার বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি এলিট ফোর্স প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেটি বিলুপ্তির মাধ্যমে নাকি পুনর্গঠনের মাধ্যমে হবে, এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনও অবস্থান জানাননি।
এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রত্যাহার হয়নি। বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, র্যাবের কাঠামো, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী থেকে ডেপুটেশনে কর্মকর্তা নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য র্যাবকে বিলুপ্ত করা নয়। বরং বাহিনীটির আচরণগত পরিবর্তন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাপ সৃষ্টি করা। তাদের ধারণা—র্যাব কাঠামোগতভাবে টিকে থাকতে পারে, তবে অপারেশনাল নেতৃত্ব ধীরে ধীরে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মতো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গুম কমিশনের সুপারিশ
এদিকে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন র্যাবকে গুমের ঘটনায় জড়িত প্রধান বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করে বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। গত ৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের ঘটনায় র্যাবের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে র্যাবকে অন্যতম প্রধান দায়ী বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করে সেটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল—র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সংযুক্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করে নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া। গুমের ঘটনায় জড়িত র্যাব কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে পুলিশের দক্ষ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি নতুন এলিট ফোর্স গঠন করা। তবে নতুন কোনও বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে মানবাধিকার মানদণ্ড ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় প্রতিবেদনে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুম সংক্রান্ত কমিশনের সিনিয়র সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “র্যাবকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক মহলে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গুম কমিশন থেকেও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে সরকার এখন পর্যন্ত সে পথে হাঁটেনি এবং নিকট ভবিষ্যতেও বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “জনগণের জানমাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা বাংলাদেশ পুলিশের রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশেরই হওয়া উচিত। আমাদের অবস্থান হচ্ছে—র্যাব বিলুপ্ত করা প্রয়োজন।”
নূর খান লিটন বলেন, “সরকার যদি বাহিনীটি বহাল রাখতে চায়, সেক্ষেত্রে এটিকে নতুনভাবে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পরিচালনা করা উচিত। র্যাবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের সংমিশ্রণ থাকা সমীচীন নয়। তিন বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করে শুধু পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে র্যাব পরিচালনা করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এলিট ফোর্স বলতে আলাদা কোনও ধারণার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ পুলিশের ভেতর থেকেই নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে একটি বিশেষ ফোর্স গঠন করা সম্ভব। আইন ও বিধিমালার আওতায় পরিচালিত একটি পেশাদার ইউনিটই জনগণের আস্থা অর্জনে বেশি কার্যকর হবে।”



