বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার উদ্বেগজনক চিত্র: সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন
বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতা: সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন

বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার উদ্বেগজনক চিত্র: সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজমানসে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবলা পশু-পাখির প্রতি যেই প্রকার নৃশংস আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়ে দিয়ে কুমিরের ভক্ষণ দৃশ্য ধারণ করা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা মানবিক বিকৃতিরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

পশু-পাখির প্রতি নৃশংস আচরণের উদাহরণ

বনের হরিণ ধরে তার পায়ে নির্দয়ভাবে কোপ দেওয়া ও সেই ছবি ফেসবুকে ছাড়া দেওয়া কিংবা পথের কুকুর-বিড়ালকে অকারণে পিটিয়ে মারার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের হৃদয়ে মায়া-মমতার স্থান দখল করেছে আদিম হিংস্রতা। অথচ এই জনপদের সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম ইসলাম পশু-পাখির প্রতি সদয় হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে।

ইসলামের শিক্ষা ও বাস্তবতার পার্থক্য

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল সকল প্রাণীই আল্লাহর একেকটি পরিবারভুক্ত। হাদিস শরিফে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি) এমনকি পশু জবাই বা কোরবানির ক্ষেত্রেও ইসলামের বিশেষ আদব রয়েছে। এক পশুর সম্মুখে অন্য পশুকে জবাই করা কিংবা পশুর প্রাণ পূর্ণরূপে নির্গত হওয়ার পূর্বে তার চামড়া খসানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • কোনো পশু-পাখিকে অহেতুক আটকে রাখা বা আটক অবস্থায় খেতে না দেওয়া
  • কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া ইত্যাদিও ধর্মীয় বিধিবিধানের লঙ্ঘন

ধর্ম যেখানে পশুর প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়, সেখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে বা বিকৃত আনন্দ লাভের আশায় প্রাণীর ওপর অত্যাচার চালানো যে ঘোরতর অপরাধ ও পাপ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মানুষের প্রতি মানুষের অমানবিক আচরণ

পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান বাংলাদেশে নিষ্ঠুরতার এই বিষবৃক্ষ কেবল ইতর প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং খোদ মানুষের প্রতি মানুষের আচরণ আজ চরম অমানবিক হয়ে উঠেছে। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যেই সহিংসতা বিদ্যমান, তা দেখলে শরীর শিহরিত হয়ে উঠে। উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের নামে যেইরূপ হামলা, মামলা ও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়, তা কোনো গণতান্ত্রিক বা সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনা করাও দুষ্কর।

  1. ভিন্নমতের মানুষকে বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারারুদ্ধ রাখা
  2. প্রাপ্য কারাবিধি বা ‘ডিভিশন’ থেকে বঞ্চিত করা
  3. গুম-খুনের মতো জঘন্য সংস্কৃতি আজ সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিষ্ঠুরতা

আবার বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহের নামে যখন বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রার্থনালয়, সভ্যতা বা সংস্কৃতির প্রতীক বা স্থাপনা প্রভৃতির ওপর বোমাবর্ষণ করা হয়, নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ ব্যক্তিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়, তখন এই নরপিশাচরা আর মানুষ থাকে না, তারা পশুর চাইতে নিকৃষ্ট প্রাণীতে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে যখন সমাজে মানুষের জীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে যায়, তখন পশুপাখির প্রতি নির্দয়তা স্বাভাবিক পরিণতি বলেই গণ্য হয়।

নৈতিক অবক্ষয় রোধের উপায়

যেই হাত রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় নিজ ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হতে দ্বিধা করে না, সেই হাত বনের হরিণ বা পথের কুকুরের প্রতি সদয় হবে—এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে হলে কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলে চলবে না, বরং প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনই সমাজকেও পশু-পাখি ও পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে।

মানুষ যদি মানুষের প্রতি দয়ালু না হয় এবং সৃষ্টির প্রতি মমতা না দেখায়, তাহলে প্রকৃতির রোষ তথা সৃষ্টিকর্তার আজাব অনিবার্য। এটি থেকে মুক্তির জন্য আমাদের সামষ্টিক আত্মোপলব্ধি ও চারিত্রিক সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই।