বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকেরা। গতকাল রাজধানীর হোটেল র্যাডিসন ব্লুতেছবি: প্রথম আলো
বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সর্বনিম্ন
বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অপতথ্য, ডিজিটাল হুমকি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে এই সংকটময় মুহূর্তকেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্মেলনের উদ্বোধন
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমন কথা উঠে আসে। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। দেশি ও বিদেশি পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আজ শেষ দিন।
ইউনেসকোর প্রতিনিধির বক্তব্য
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইস বলেন, গত দুই বছরে গণমাধ্যম নিয়ে মিডিয়া রিফর্ম কমিশন, এমআরডিআই, ইউএনডিপি ও ইউনেসকোর রিপোর্টসহ বিস্তর বিশ্লেষণ ও আলোচনা হয়েছে। এখন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উল্লেখ করে সুজান ভাইস বলেন, এই মুহূর্তটিই পরিবর্তনের বড় সুযোগ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড খুব ভালো না হলেও এই মুহূর্তটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ঝুঁকির সম্মুখীন। গত এক দশকে সারা বিশ্বে কমপক্ষে ৫০০ সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণ দিতে হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ গত ১৭ বছর, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে ছিল। সেই সময়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। সে সময় তৎকালীন সরকারের নীরব ভূমিকা সবাইকে আশাহত করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সম্মেলনে উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা বেরিয়ে আসবে।
সুইডেন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বিশ্বজুড়ে তথ্য পরিবেশ এখন গভীর সংকটে। মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন–আস্থা ক্ষয় পাচ্ছে এবং সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের মুখে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, অপরিহার্য।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জোর
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব এবং বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংকটময় সময়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে।
এমিলিয়া দিয়াজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অপতথ্য আজ সারা বিশ্বের নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
স্বাগত বক্তব্য
স্বাগত বক্তব্যে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গণমাধ্যম বাইরের কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। নিউজরুমের নিজস্ব নীতি ও নৈতিকতার আলোকে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার একমাত্র পথ।
শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রথম অধিবেশনে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান। গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণের ফলে দেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এর মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। তবে দেশে অতীতে যথেষ্ট পরিমাণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি। বর্তমানেও হচ্ছে না। আর ভবিষ্যতেও হবে কি না, তা নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর।
এ অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, টরন্টো স্টার পত্রিকার সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক এবং যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ। এ অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার।
পরে আরও তিনটি অধিবেশনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নিউজরুমে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি এবং তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রথম দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী
প্রথম দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, পরিবর্তিত এবং রূপান্তরিত গণমাধ্যম ব্যবস্থায় অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয়েছে। যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন এবং গণমুখী গণমাধ্যমের জন্য কাজ করতে চায়, তাদেরকে এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে হবে।



