যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি সাম্প্রতিক গোপন প্রতিবেদনে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ায় এটি এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা এই নথিতে দাবি করা হয়েছে যে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ইরান এখনো তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মাত্র ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।
সিআইএর মূল্যায়ন ও ট্রাম্পের দাবির দ্বন্দ্ব
সিআইএর এই গোপন মূল্যায়ন ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্যকর রয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ প্রায় সকল ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামগুলো দ্রুত মেরামতের পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেপণাস্ত্রও তাদের ভান্ডারে যুক্ত করেছে। এই তথ্যগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার আশাবাদকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইরানের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন নৌ অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে থাকলেও এবং তারা প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারালেও, দেশটি এখনো তিন থেকে চার মাস অনায়াসেই টিকে থাকতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিআইএর চারজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন যে, ইরান তাদের ট্যাংকারগুলোতে প্রচুর তেল মজুত করে রেখেছে এবং বিকল্প হিসেবে মধ্য এশিয়া হয়ে রেলপথে বা স্থলপথে তেল পাচারের চেষ্টা করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা প্রশাসনের অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
যুদ্ধবিরতি ও কৌশলগত জটিলতা
এদিকে হোয়াইট হাউস এবং প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল বিজয় হিসেবে প্রচার করা অব্যাহত থাকলেও ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মতো শর্তগুলো মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তেহরানের পক্ষ থেকে এমন এক সময়ে এই দৃঢ়তা দেখানো হচ্ছে যখন তাদের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা ও সামরিক সরঞ্জাম যুদ্ধের প্রথম দিকেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল এলাকায় জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরানের সস্তা ড্রোনগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ মাত্র একটি ড্রোন হামলাও আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলোকে তেল ট্যাংকারের বিমা সুবিধা বন্ধ করে দিতে বাধ্য করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযান কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। তাঁর মতে, সামরিক সাফল্য সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত বা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। উল্টো দীর্ঘ অবরোধ এবং বিমান হামলার মুখেও এ ধরনের শাসনব্যবস্থা বছরের পর বছর টিকে থাকার ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চললেও এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পর্যালোচনার কথা জানালেও, সিআইএ-র এই গোপন রিপোর্ট প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ময়দান ট্রাম্প প্রশাসনের বর্ণনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং অমীমাংসিত।



