২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের পুংলীপাড়ায় স্বামী আবদুর রহমান ভোলার বাড়ি থেকে আজমিরা খাতুনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিলেন এটি আত্মহত্যা। স্বামীর পরিবারের দাবি ছিল, গভীর রাতে ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস নিয়েছিলেন তিনি। সুরতহাল প্রতিবেদনে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও চিকিৎসক আত্মহত্যার পক্ষে মত দেন। থানা-পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছিল যে আজমিরা আত্মহত্যা করেছেন।
বাবার মামলা ও পিবিআই তদন্ত
তবে আজমিরার বাবা জুরান আলী শেখ বিষয়টি মানতে রাজি ছিলেন না। তিনি আদালতে মামলা করলে সেটির তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে। তদন্তের শুরুতেই আজমিরার লাশের ছবি দেখে সন্দেহ করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। ছবিতে দেখা যায়, মৃতদেহের চুলে আটকে আছে কয়েকটি আঁকড়ার গুটি। কেন ঘরের ভেতরে মারা যাওয়া এক নারীর চুলে থাকবে ডোবার পাশের জঙ্গলে জন্মানো আঁকড়াগাছের গুটি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেরিয়ে এল ভয়ংকর এক হত্যার গল্প।
হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা
প্রথমে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ির পাশের ডোবার কাছের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে। সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু পরে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গভীর রাতে আবার লাশ তুলে ধুয়ে ঘরে এনে খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়। সকালে ছড়িয়ে দেওয়া হয় আত্মহত্যার গল্প। তদন্তে উঠে আসে, আজমিরাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর প্রথমে লাশ গুম করার চেষ্টা করেন তাঁর স্বামী ও পরিবারের লোকজন। কিন্তু জঙ্গলে নেওয়ার সময়ই আজমিরার চুলে লেগে যায় আঁকড়াগাছের গুটি, যা শেষ পর্যন্ত খুলে দেয় হত্যার রহস্য।
পাঁচজনের মিলিত হত্যাকাণ্ড
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার দিন (২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল) রাত ১১টার পর আজমিরা খাতুনকে পরস্পর যোগসাজশে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তাঁর স্বামী আবদুর রহমান, শ্বশুর সাঈদ আকন্দ, শাশুড়ি বুলবুলি বেগম এবং ননদ আকলিমা বেগম ও আমেনা বেগম। লাশ বাড়ির পশ্চিম পাশে ডোবার কাছের আঁকড়াগাছের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় গভীর রাতেই লাশ আবার তুলে আনা হয়। এরপর লাশ ধুয়ে ঘরের খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয়। পরদিন সকাল ছয়টার দিকে আজমিরার শ্বশুর সাঈদ আকন্দ ও শাশুড়ি বুলবুলি বেগম প্রতিবেশীদের ডেকে এনে দাবি করেন যে আজমিরা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গ্রামবাসী ফাঁসের রশি দেখতে চাইলে তাঁরা বলেন, আজমিরা ওড়না দিয়ে ফাঁস দিয়েছেন। তবে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে গ্রামবাসী অনেকের সন্দেহ ছিল।
থানা-পুলিশের গাফিলতি
পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কখনো কখনো একটি ছোট্ট আলামতই বদলে দিতে পারে পুরো তদন্তের গতিপথ। আজমিরা খাতুনের চুলে আটকে থাকা আঁকড়ার গুটির সূত্র ধরেই জানা গেছে যে তিনি আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তবে থানা-পুলিশ এ মামলার ক্ষেত্রে দায়সারা তদন্ত করেছে। আজমিরার লাশ উদ্ধারের পর নানা ঘটনার মধ্য দিয়েই মনে হয়েছে যে এটি আত্মহত্যা নয়। অথচ থানা-পুলিশ এসব বিষয় আমলেই নেয়নি।
প্রকাশিত বইয়ে বিস্তারিত
চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের আজমিরা খাতুন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।



