মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও যুদ্ধের আতঙ্ক, বিমান হামলায় কেঁপে উঠল টেকনাফ
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে আবারও যুদ্ধের আতঙ্ক

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ফের উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিট থেকে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় কমপক্ষে চার দফা শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর বৃহস্পতিবার সকাল ও বিকালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এসব বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়।

সীমান্তবাসীর আতঙ্ক ও বিজিবির সতর্কতা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহু মাস পর আবারও সীমান্তের ওপারের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব অনুভব করছেন তারা। টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের নাফ নদসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, 'হঠাৎ ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদের ওপারে আগুনের লেলিহান শিখাও দেখা গেছে।'

এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা বা সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে।' তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন উদ্বেগ

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। মিয়ানমারে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে আসা মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, 'বৃহস্পতিবার সকালেও মংডু এলাকায় গোলার বিকট শব্দ শোনা গেছে। মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা মংডু ও বুথিডংয়ে তাদের সদরদফতর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব আশপাশের কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামেও পড়েছে। এতে দুই জন রোহিঙ্গা হতাহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এ ছাড়া ২০ থেকে ৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।'

তিনি আরও বলেন, 'মংডু এলাকায় এখনো হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন। কখন কী ঘটে, তা বলা খুবই কঠিন। কেননা গত দুই দিনে ৩০টির মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে।'

প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, 'দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকার পর রাখাইনে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ায় আমরা গভীর উদ্বেগ ও হতাশার মধ্যে রয়েছি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সেখানে যদি আবার যুদ্ধ চলতে থাকে, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।'

তিনি আরও বলেন, 'রাখাইনে এখনও বসবাসরত রোহিঙ্গারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। চলমান সংঘাতে যদি আবারও প্রাণহানি ও সহিংসতা বাড়ে, তাহলে জীবন বাঁচাতে অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।'

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি

রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং (মুসলিম) গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ (Y-12) উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বোমা নিক্ষেপ করে। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরণ হতে পারে।

উল্লেখ্য, টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে মংডু, বুথিডং ও রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা (২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত) দখলে নেয় আরাকান আর্মি। দখল করা এই এলাকার বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অবস্থিত। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থানে নতুন করে হামলা শুরু করে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। পাশাপাশি মিয়ানমারের তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, 'মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের বিজিবি-কোস্টগার্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।'