চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের চীন সফরের সময় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, সরকার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে এবং ইতিবাচকভাবে দেখছে।
প্রস্তাবিত করিডোরের রুট ও সম্ভাবনা
করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে ইয়াঙ্গন ও রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে সড়ক ও রেলপথে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এটি ২০১৩ সালে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের একটি সংস্করণ, যা ভারতের আপত্তিতে স্থগিত হয়েছিল।
মিয়ানমার কেন্দ্রিক চ্যালেঞ্জ
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিশেষ করে আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর লড়াই এবং রাখাইনের বড় অংশ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা করিডোর বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে এসব সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা
ভারতের আপত্তি আগেও বিসিআইএম বাস্তবায়নে বাধা ছিল। এখন ভারতকে বাদ দিয়ে এই করিডোর এগোলে ভারতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তৃতীয় দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করা যাবে না যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করে এই শর্ত দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, করিডোরটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়াবে এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, এটি বাংলাদেশকে চীনের পাশাপাশি আসিয়ানের ১০টি দেশের সঙ্গেও সংযুক্ত করবে, যা বাণিজ্যে বিপ্লব আনতে পারে। সরকার মনে করে, এতে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
তিস্তা প্রকল্প ও অন্যান্য সহযোগিতা
চীন তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পসহ অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। বিএনপি সরকার উত্তরাঞ্চলের কৃষির স্বার্থে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর, যদিও এখানেও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রয়োজন
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো নির্ভর করবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার ওপর। হুমায়ুন কবির বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। চীনের সঙ্গে ‘দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।



