আইনস্টাইন-ঠাকুরের দার্শনিক আলাপ: সত্য-সৌন্দর্যের দ্বন্দ্ব
বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইন ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে এক গভীর দার্শনিক আলোচনা হয়েছিল, যেখানে সত্য ও সৌন্দর্যের প্রকৃতি নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়। এই আলোচনায় বিজ্ঞান ও মানবিকতার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, 'আপনি গণিত দিয়ে সময় ও স্থান—এই দুই প্রাচীন সত্তাকে জয় করতে ব্যস্ত। আর আমি তখন এ দেশে মানুষের শাশ্বত পৃথিবী আর বাস্তবতার মহাবিশ্ব নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছি।'
আইনস্টাইন জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনি কি জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ঐশী সত্তায় বিশ্বাস করেন?'
রবীন্দ্রনাথ উত্তর দেন, 'বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের অসীম ব্যক্তিত্ব মহাবিশ্বকে ধারণ করে। মহাবিশ্বকে আমরা যেটুকু জানি বা অনুভব করি, তা মানুষের বোধের মাধ্যমেই জানছি। আর এ থেকে প্রমাণিত হয় যে মহাবিশ্বের সত্য আসলে মানবিক সত্য।'
আইনস্টাইন বলেন, 'মহাবিশ্বের স্বভাব নিয়ে তো দুটি ভিন্ন ধারণা রয়েছে—জগৎ হয় মানবনির্ভর এক অখণ্ড সত্তা, নয় মানবনিরপেক্ষ এক স্বাধীন বাস্তবতা।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মহাবিশ্ব যখন শাশ্বত মানুষের চেতনার সঙ্গে এক সুরে বাঁধা পড়ে, তখন আমরা তাকে সত্য বলে চিনতে পারি। আর তার মধ্যেই খুঁজে পাই সৌন্দর্যের অনুভূতি।'
আইনস্টাইন বলেন, 'আপনি মহাবিশ্বকে শুধু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখছেন।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'জগৎ হচ্ছে একটি মানবিক বিশ্ব। বৈজ্ঞানিকের কাছেও এটি তা–ই। তাই আমাদের বাইরে পৃথিবীর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই আপেক্ষিক পৃথিবী তার বাস্তবতার জন্য আমাদের চেতনার ওপর নির্ভর করে। এই জগৎকে যে যুক্তি ও রসবোধ সত্য করে তুলেছে, তা সেই শাশ্বত মানুষের। সেই শাশ্বত মানুষ আমাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করেন। যুক্তি ও উপভোগের এমন এক মানদণ্ড রয়েছে, যা জগৎকে সত্য করে তোলে। এটি সেই শাশ্বত মানুষের মানদণ্ড, যা আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়ে ওঠে।'
আইনস্টাইন বলেন, 'এটি তো তাহলে মানুষের সত্তারই একটি উপলব্ধিমাত্র।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'পরম সামঞ্জস্যের যে আদর্শ বিশ্বসত্তায় বিরাজমান, তা-ই সৌন্দর্য। আর বিশ্বজনীন মনের যে পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি, তা-ই হলো সত্য। আমরা মানুষেরা আমাদের ভুলভ্রান্তি ও সঞ্চিত অভিজ্ঞতার পথ ধরে আর প্রজ্ঞালব্ধ চেতনার মাধ্যমে সেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাই।'
রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন, 'হ্যাঁ, এক চিরন্তন সত্তা। আমাদের আবেগ ও কর্মের মধ্য দিয়েই তাকে উপলব্ধি করতে হবে। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়েই সেই পরমকে অনুভব করি, যার নিজের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বিজ্ঞান সেই সত্যগুলো নিয়ে কাজ করে, যা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এ হচ্ছে নৈর্ব্যক্তিক মানবজগতের সত্য। ধর্ম সেই সত্যগুলোকে হৃদয়ঙ্গম করে। মানুষের জীবনের নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সেগুলোর যোগসূত্র স্থাপন করে। তখন আমাদের সত্যের ব্যক্তি–উপলব্ধি এক বিশ্বজনীন মাত্রা পায়। ধর্ম সত্যকে মূল্যবোধের আলোয় বিচার করে আর সত্যের সঙ্গে আমাদের আত্মিক সামঞ্জস্যের মাধ্যমেই আমরা তাকে ‘মঙ্গলময়’ বলে জানি।'
আইনস্টাইন জিজ্ঞাসা করেন, 'তাহলে সত্য বা সৌন্দর্য কি মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয়?'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'না, আমি তা বলছি না।'
আইনস্টাইন বলেন, 'পৃথিবীতে যদি আর কোনো মানুষ না থাকে, তবে অ্যাপোলো বেলভেডের মূর্তিটি কি আর সুন্দর থাকবে না?'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'না!'
আইনস্টাইন বলেন, 'সৌন্দর্যের এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত। তবে সত্যের ক্ষেত্রে এই ধারণা মানতে পারছি না।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'কেন নয়? সত্য তো মানুষের মাধ্যমেই উপলব্ধি করা হয়।'
আইনস্টাইন বলেন, 'আমার ধারণাটি যে সঠিক, তা আমি প্রমাণ করতে পারব না, কিন্তু এটাই আমার ধর্ম।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'পরম সামঞ্জস্যের যে আদর্শ বিশ্বসত্তায় বিরাজমান, তা-ই সৌন্দর্য। আর বিশ্বজনীন মনের যে পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি, তা-ই হলো সত্য। আমরা মানুষেরা আমাদের ভুলভ্রান্তি ও সঞ্চিত অভিজ্ঞতার পথ ধরে আর প্রজ্ঞালব্ধ চেতনার মাধ্যমে সেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাই। এটা ছাড়া কি আর কোনো উপায় আছে?'
আইনস্টাইন বলেন, 'জার্মান ভাষায় ‘প্রজাতি’ শব্দটি সব মানুষের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। বস্তুত বনমানুষ কিংবা ব্যাঙও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আসল সমস্যাটা হলো, সত্য আমাদের চেতনার ওপর নির্ভর করে, নাকি চেতনা থেকে তা স্বাধীন।'
আইনস্টাইন আরও বলেন, 'আমার কাছে এর কোনো প্রমাণ নেই; তবে আমি পিথাগোরাসের এই ধারণায় বিশ্বাসী যে সত্য মানুষের অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে না। এটি আসলে ধারাবাহিকতার যুক্তিবোধের একটি অমীমাংসিত সমস্যা।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'বিশ্বসত্তার সঙ্গে একীভূত যে সত্য, তার ভিত্তি অবশ্যই মানবিক। অন্যথায় আমরা ব্যক্তিরা যা সত্য বলে উপলব্ধি করি, তা কখনোই ‘সত্য’ বলে গণ্য হতে পারে না। অন্তত সেই সত্যের কথা ভাবুন, যাকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয়। কেবল যুক্তির প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সে সত্যে পৌঁছানো সম্ভব। অন্যভাবে বলতে গেলে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমেই এটি অর্জন করা যায়। ভারতীয় দর্শনে ব্রহ্ম বলে একটা কথা আছে, যার মানে হলো পরম সত্য। আমাদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত মন নিয়ে তা কখনো পাওয়া যায় না। এ সত্যকে পেতে হলে অসীমের মধ্যে বিলীন হওয়া ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। কিন্তু এ ধরনের সত্য বিজ্ঞানের আওতায় পড়া সম্ভব নয়। আমরা এখানে যে সত্য নিয়ে আলোচনা করছি, তা হলো মানবমনের কাছে যা সত্য বলে প্রতিভাত হয়, তা—একে মায়া বলা যেতে পারে।'
আইনস্টাইন বলেন, 'এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের মায়া নয়, বরং পুরো মানবজাতির মায়া।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'প্রজাতিও তো একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ, মানবতার অংশ। তাই সামগ্রিক মানবমনই সত্যকে উপলব্ধি করে। ভারতীয় ও ইউরোপীয় মন এক সাধারণ উপলব্ধিতে এসে মিলিত হয়।'
আইনস্টাইন বলেন, 'জার্মান ভাষায় ‘প্রজাতি’ শব্দটি সব মানুষের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। বস্তুত বনমানুষ কিংবা ব্যাঙও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আসল সমস্যাটা হলো, সত্য আমাদের চেতনার ওপর নির্ভর করে, নাকি চেতনা থেকে তা স্বাধীন।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মানে যা–ই হোক, যদি এমন কোনো সত্য থেকে থাকে, যার সঙ্গে মানবতার কোনো সম্পর্ক নেই, তবে আমাদের কাছে সে রকম সত্যের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।'
রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন, 'আমরা যাকে সত্য বলি, তা বাস্তবতার বিষয়গত (অবজেক্টিভ) ও বিষয়ীগত (সাবজেক্টিভ) দিকের মধ্যে এক যৌক্তিক সামঞ্জস্য। আর এই উভয় দিকই সেই বিশ্বমানবের অন্তর্গত।'
আইনস্টাইন বলেন, 'এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও আমরা আমাদের মন দিয়ে এমন অনেক কিছু করি, যার জন্য আমরা দায়ী নই। মন তার বাইরের এমন বাস্তবতাকে স্বীকার করে, যা তার থেকে স্বাধীন। উদাহরণস্বরূপ, এই ঘরে হয়তো কেউ নেই, তবু টেবিলটি যেখানে ছিল, সেখানেই তো থেকে যাবে।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'হ্যাঁ, এটি ব্যক্তিমনের বাইরে থেকে যাবে ঠিকই, কিন্তু বিশ্বজনীন মনের বাইরে নয়। টেবিলটি আসলে তা-ই, যা আমাদের কোনো একধরনের চেতনার মধ্য দিয়ে অনুভূত হয়।'
আইনস্টাইন বলেন, 'ঘরে কেউ না থাকলেও টেবিলটি সেখানেই আছে; কিন্তু আপনার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সেটা মানা যায় না। কারণ, আমাদের ছাড়া টেবিলটির সেখানে থাকার অর্থ কী, তা আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি না। মানুষ থাকুক বা না থাকুক, সত্যের যে নিজস্ব অস্তিত্ব আছে—এই স্বাভাবিক ধারণা আমরা ব্যাখ্যা বা প্রমাণ করতে পারি না। তবে এটি এমন এক বিশ্বাস, যা সবার মধ্যেই থাকে। এমনকি আদিম মানুষের মধ্যেও। আমরা সত্যের ওপর এমন এক গুণ আরোপ করি, যা মানুষের মুখাপেক্ষী নয়। এমন এক বাস্তবতার ধারণা আমাদের জন্য অপরিহার্য, যা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অভিজ্ঞতা বা আমাদের মনের ওপর নির্ভর করে না। যদিও এর মানে কী, তা আমরা বলতে পারব না।'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মানে যা–ই হোক, যদি এমন কোনো সত্য থেকে থাকে, যার সঙ্গে মানবতার কোনো সম্পর্ক নেই, তবে আমাদের কাছে সে রকম সত্যের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।'
আইনস্টাইন বলেন, 'তাহলে তো আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক!'
রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'সেই অতিব্যক্তিক পুরুষ, সেই বিশ্বজনীন সত্তাকে আমার এই ক্ষুদ্র ব্যক্তিসত্তায় পুনর্মিলিত করার মধ্যে আমার ধর্ম নিহিত রয়েছে।'
জাভেদ হুসেন: লেখক, অনুবাদক ও সাংবাদিক



