তিস্তা নদী বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের সম্পৃক্ততা ও সমর্থন কামনা করেছে বাংলাদেশ। বুধবার বেইজিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে এই প্রত্যাশার কথা জানানো হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের এক যৌথ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যাতে এই প্রস্তাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম চীন সফর
বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে প্রথমবারের মতো চীন সফর করছেন। বৈঠকে উভয়পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা করেছে।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি
উভয়পক্ষই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি দৃঢ়ভাবে মেনে চলা, উচ্চ পর্যায়ের বিনিময়ের গতি বজায় রাখা, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় আরও গভীর করা এবং চীন-বাংলাদেশ সর্বাঙ্গীন কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
এক চীন নীতি
বৈঠকে উভয়পক্ষই জোর দিয়ে জানায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজ্যুলিউশন ২৭৫৮-এর কর্তৃত্ব কোনো প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তার দৃঢ় আনুগত্য এবং অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। উল্লেখ করা হয়, তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং চীন সরকার সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে এবং জাতীয় পুনর্মিলন অর্জনে চীন সরকারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
চীনের সমর্থন
বৈঠকে চীনও জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া উন্নয়ন পথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগিতা
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়কালে একটি ভালো সূচনা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ চীনকে অভিনন্দন জানিয়েছে। চীন তার রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সমর্থন করে। উভয়পক্ষ উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা বৃদ্ধি, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
বৈশ্বিক উদ্যোগ
বাংলাদেশ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত মানবজাতির জন্য অভিন্ন ভবিষ্যতের একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং চীনের দূরদর্শী প্রধান বৈশ্বিক উদ্যোগগুলিকে মূল্যায়ন ও স্বাগত জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ইস্যু
জাতিসংঘের সনদের উদ্দেশ্য ও নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতা ও গণতন্ত্র এবং বিরোধ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি উভয় পক্ষই তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষই যৌথভাবে একটি সমান ও সুশৃঙ্খল বহুপাক্ষিক বিশ্ব এবং সর্বজনীনভাবে লাভজনক ও সমন্বিত অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রসারে সম্মত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মিয়ানমার
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা ও প্রচারের জন্য রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত চারটি প্রস্তাবের ভূয়সী প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। উভয়পক্ষই অবিলম্বে সর্বাঙ্গীন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। শান্তি পুনরুদ্ধার, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক যাতায়াত বজায় রাখার জন্য অনুকূল সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে। উভয় পক্ষ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মোকাবিলায় যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত রয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সমস্যার পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানে চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীন তার সাধ্যমতো প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
কৃতজ্ঞতা ও আমন্ত্রণ
চীন সফরকালে ড. খলিলুর রহমান ও তার প্রতিনিধি দলকে দেওয়া উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং সে দেশের সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেইসঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।



