মহাখালীর ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের গবেষণাগারে সারা দেশের জন্য হাম পরীক্ষা করা হয়। দেশের অন্য কোথাও এই সুবিধা নেই। গত এপ্রিল মাস থেকে এই গবেষণাগারে পরীক্ষার কিটের তীব্র সংকট চলছে। কিন্তু জরুরি পদক্ষেপের অভাবে নতুন কিট এখনও আসেনি। ফলে নতুন কিট না এলে ১১ মে’র পর সারা দেশে হামের নমুনা পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রতিদিন প্রায় ৩০০ নমুনা আসে
ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন গড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৩০০ রোগীর নমুনা আসে। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন কিট না এলে বর্তমান গতিতে পরীক্ষা চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটজনক হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একে মহামারি ঘোষণা করে সমন্বিত চিকিৎসা প্রোটোকল চালু করা গেলে কর্তৃপক্ষ মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও মোতায়েন করতে পারবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার কভারেজ বাড়ালে রোগী শনাক্ত, আইসোলেশন ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কিট সরবরাহে ডব্লিউএইচও’র ভূমিকা
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হাম পরীক্ষার কিট সরবরাহ করে। প্রতিটি কিট দিয়ে ৯০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। সংকটের কারণে পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো যাচ্ছে না; বরং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যার ফলে অনেক নমুনা অপরীক্ষিত থেকে যাচ্ছে। গত সোমবার পর্যন্ত সাতটি কিট মজুত ছিল, যা দুই দিনে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাইরোলজিস্ট মাহবুবা জামিল বলেন, “এখন সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়, তবে কিট শেষের দিকে। আমরা ডব্লিউএইচওকে জানিয়েছি, তারা বলেছে এক থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগবে। এর মধ্যে বর্তমান কিট দিয়েই কাজ চালাতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “কিট সীমিত হওয়ায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে পুরোপুরি ফুরিয়ে না যায়। হটস্পট এলাকা থেকেও আগের তুলনায় কম নমুনা আসছে।”
নতুন কিট আসবে ১৫ মে’র দিকে
ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, “প্রায় এক মাস আগে ডব্লিউএইচওতে কিটের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি। আশা করছি ১৫ মে’র দিকে কিট আসবে। বর্তমানে অবশিষ্ট কিট দিয়েই পরীক্ষা চলছে।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, “কিট সরবরাহের দায়িত্ব ডব্লিউএইচও’র। তারা গাভি ও ইউনিসেফ থেকে অর্থ পেয়েছে। সময়মতো কিট সরবরাহ করা উচিত ছিল। সরকার ও ইউনিসেফের ডব্লিউএইচও’র ওপর চাপ দেওয়া উচিত।”
চিকিৎসায় দেরি হলে জটিলতা বাড়ে
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসায় দেরি হলে শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন স্বল্পতা, মস্তিষ্কের প্রদাহ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ও খিঁচুনির মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। তারা বলেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা চালু করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা সম্ভব হবে, পাশাপাশি ঢাকার চাপও কমবে। চিকিৎসকরা জানান, দেশে নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু নতুন নয়, কিন্তু মৃত্যুহার কমানোর কার্যকর উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে নেই। জেলা পর্যায়েও অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।
জরুরি অবস্থা জারির দাবি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হুসাইন বলেন, “হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শনাক্ত করার পর জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়ত।” তিনি আরও বলেন, জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান জোরদার করা, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো এবং অক্সিজেন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন জরুরি। “কিটের চেয়ে টিকাদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিট মূলত রোগী শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু টিকাদান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর,” তিনি বলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক মঈনুল আহসান বলেন, “ডব্লিউএইচও বলেছে এক-দুই দিনের মধ্যে কিটের ব্যবস্থা করা হবে। সরবরাহ কমলেও এখনও সংকট তৈরি হয়নি। নমুনা পরীক্ষা বন্ধ হয়নি।” টিকাদান কভারেজ প্রায় ৯৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় ২৪ এপ্রিল ডব্লিউএইচও বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে। ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এটি সম্প্রসারিত হয়। জরুরি কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১ কোটি ৬৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৯৩ শতাংশ।
সংক্রমণ পরিস্থিতি
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, “সংক্রমিত অধিকাংশ শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়। নিউমোনিয়া থাকলে তারা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা দেরিতে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসেন, যা রোগের তীব্রতা বাড়ায়।” গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামজনিত উপসর্গে সাত শিশু মারা গেছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৮১ শিশু উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৬৮ শিশু উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, যার মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। সর্বমোট ৪৪ হাজার ২৬০ শিশু উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে এবং ৩০ হাজার ৮৮৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ২২৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।



