তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, একটি আধুনিক সভ্য রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সচল রাখতে এবং রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে গণমাধ্যমের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য
শনিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের নতুন চ্যালেঞ্জ অপতথ্য: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এমনভাবে স্থবির হয়ে গিয়েছিল যে, একটি রক্তাক্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে পুনরায় চালু করতে হয়েছে। জনগণ অবাধ ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই পুনঃসূচনা রাষ্ট্র নতুন এক আশাবাদের সৃষ্টি করেছে।
গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ
সভ্য রাষ্ট্রের কাঠামোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যম হচ্ছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তিনি নর্ডিক দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, সেসব দেশে গণমাধ্যম কোনো আনুষ্ঠানিক স্তম্ভ না হলেও তা সমাজকে এক জীবন্ত জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে। নির্বাচনি গণতন্ত্রকে যদি পাঁচ বছর জীবন্ত রাখতে হয়, তবে গণমাধ্যমই হচ্ছে একমাত্র মাধ্যম যা জনগণের প্রত্যাশাকে বাঁচিয়ে রাখে।
অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ
তথ্যমন্ত্রী বর্তমান সময়ের তথ্য প্রবাহের জটিলতা তুলে ধরে বলেন, আজকের যুগে তথ্য সরবরাহের বাধার চেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্যকে নিজ নিজ আদর্শ বা রঙের পাত্রে উপস্থাপন করা। বর্তমান ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অপতথ্য ও ভুল তথ্য মোকাবিলা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, অক্সিজেন ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি সভ্য সমাজের অক্সিজেন হলো বিশুদ্ধ তথ্য। দূষিত তথ্য সমাজকে অসুস্থ করে তোলে।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সমালোচনা
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, যা দুঃশাসনের অন্যতম বড় উদাহরণ। বর্তমান সরকার স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। তথ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে গণমাধ্যম জগতের সমস্যা চিহ্নিত করেছে এবং এখন অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে টেকসই সমাধান বের করার পথে হাঁটছে।
সাংবাদিকদের বেতন ও সম্মান
সাংবাদিকদের মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করেই গণমাধ্যম শিল্প টিকে আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকরা কোনো পণ্য উৎপাদন করেন না, তারা সংবাদ তৈরি করেন। আপনাদের উৎপাদিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করেই মালিকপক্ষ ব্যবসা করে। তাই সাংবাদিকদের বেতন ও সম্মানের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিএফইউজে, ডিইউজেসহ সব সাংবাদিক সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, নতুন যুগের ভাইরাসের জন্য নতুন অ্যান্টিভাইরাস প্রয়োজন। ডিজিটাল এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের পুরনো মানসিকতা ত্যাগ করে আধুনিক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা করতে হবে।
যুগান্তর সম্পাদকের বক্তব্য
যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, গত ১৫ বছরে মানুষের চারিত্রিক ব্যাপক অবক্ষয় হয়েছে। এই বিধ্বস্ত চরিত্র মেরামত করে সততা ও কল্যাণের পথে ফিরিয়ে আনা একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। বর্তমানে গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি সরকারি সেন্সরশিপ আগের মতো নেই। অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো তারা সংবাদপত্রের ওপর চাপ তৈরি করত না; বড়জোর অনুরোধ করত। বর্তমানেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে সংবাদ সম্পাদনার ক্ষেত্রে কোনো বৈরী নির্দেশনা বা হস্তক্ষেপ পাইনি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ ফ্যাসিবাদের আমলের চেয়ে বর্তমানে কিছুটা কম হলেও মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। এর ফলে গণমাধ্যমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘আত্ম-সেন্সরশিপ’। সাংবাদিকরা নিজেরাই এখন ভাবেন যে কোন সংবাদটি প্রকাশ করলে মন্ত্রী বা প্রভাবশালীরা খুশি হবেন। সত্য আড়াল করে কাউকে খুশি করার এই প্রবণতা অত্যন্ত আত্মঘাতী।
সভার অন্যান্য বক্তা
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলমের সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআইডির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ।
এতে আরও বক্তৃতা করেন মরহুম প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব ও প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, বাংলা ভিশনের উপদেষ্টা ড. আব্দুল হাই সিদ্দিক, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাসির জামাল, ডিইউজের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজু প্রমুখ।



