সংসদে 'গুপ্ত' লেখাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত বিতর্ক
গতকাল মঙ্গলবার 'গুপ্ত' লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর থেকে এই বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে, 'গুপ্ত' কথাটি জাতীয় সংসদেও পৌঁছে যায়, যেখানে বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও হইচই দেখা গেছে।
সরকারি দলীয় সংসদ সদস্যের বক্তব্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯তম দিন বুধবার বিকালে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বলেন, "শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সদ্যজাত সরকার কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু, অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, আমাদের এই সংসদের বিরোধী দলের ভাইয়েরা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে এই সরকারকে নাজেহাল করার জন্য যে চক্রান্ত চালাচ্ছে, যে চক্রান্তের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় দাঁড়িয়ে তিনি আরও বলেন, "৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে তারা মেনে নিতে পারে নাই। যারা ৭১ সালের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না, তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন চাইতে পারে না। ৭১ সালের জন্ম হওয়া বাংলাদেশকে তারা মেনে নিতে পারে নাই বলে আজকে সদ্যজাত সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে।"
স্পিকারকে সম্বোধন করে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা উল্লেখ করেন, "আপনি শুনেছেন, চট্টগ্রামে গতকাল সিটি কলেজে ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে কারা? শিবির। কী অপরাধ ছিল ছাত্রদলের? ছাত্রদল শুধু বলেছে, গুপ্ত। ছাত্রদল লিখেছে গুপ্ত, সেই জন্যই তারা গুপ্ত শব্দকে উল্লেখ করে ছাত্রদলের ওপর হামলা করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ওপর আঘাত করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "আজকে আমাদের বিরোধী দলের ভাইয়েরা ক্ষেপে উঠেছেন, এই সংসদে গণতান্ত্রিকভাবে কথা বলার অধিকার দিতে চায় না। চট্টগ্রামের ছাত্রদল কী কথা বলেছে, গুপ্ত বলেছে। এই সংসদে আমরা নির্বাচিত হয়ে আসছি কথা বলার জন্য। বিরোধী দলের ভাইয়েরা আজকে কণ্ঠ চিপে ধরতে চায় ফ্যাসিস্টের মত।"
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া ও স্পিকারের হস্তক্ষেপ
আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞার বক্তব্যের পর বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, "প্রথমে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এখানে যে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এটা এক্সপ্যাঞ্জ করা হোক। একজন সংসদ সদস্য সংসদের ভিতরে দাঁড়িয়ে যে হুমকির ভাষায় কথা বললেন, আমরা এতে আঘাত পেয়েছি এবং আমরা আমাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছি। জনগণ বসে থাকবে না মানে কী? তিনি কি উসকাইয়া দিচ্ছেন জনগণকে? বিশৃঙ্খলার দিকে? এগুলা সংসদীয় আচরণ না।"
এ সময় স্পিকার বলেন, "আমরা পরীক্ষা করে দেখবো, যদি কোনও অসংসদীয় ভাষা থাকে সেটা আমরা এক্সপ্যাঞ্জ করবো, যদি থাকে। আর দ্বিতীয়ত, এটা তো বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা। আমরা চুপ করে থাকবো না, এগুলো তো শত বছর ধরে রাজনীতিবিদরা বলে এসেছেন। আপনারা যখন বক্তৃতা দেবেন তখন এর জবাব দেবেন।"
স্পিকার আরও উল্লেখ করেন, "রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে, তাদের কথাবার্তার সবাই সবটাই পছন্দ হবে এমন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু, অনুগ্রহ করে শুনুন, আমার কথাটি শুনুন। এখন আপনাদের একজন বক্তাকে আমি দিচ্ছি। উনি (বিরোধী দলীয় নেতা) যা যা বলেছে প্রয়োজন হলে তারা আপনারা জবাব দিতে পারবেন। বক্তব্যের মাধ্যমে জবাব দেন। একজন বক্তাকে বক্তব্যের সময় অনুগ্রহ করে ডিস্টার্ব করবেন না।"
পাহাড়ি অঞ্চলের উন্নয়নের দাবি
আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা পাহাড়ি অঞ্চলের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, "আমি পাহাড়ের জনগণকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। পাহাড়ের জনগণ পাহাড়ি বাঙালি সবাই আমাকে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত করেছে। সেই পাহাড়ের গণমানুষের জন্য, পাহাড়ের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।"
তিনি পাহাড়ি অঞ্চলে উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেন:
- পাহাড়ি অঞ্চলে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
- পার্বত্য জেলার মানুষের চিকিৎসার সুবিধার্থে টারশিয়ারি লেভেলের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা প্রয়োজন।
- বন সম্পদ রক্ষার জন্য একটি বন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার, যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।
তিনি বলেন, "বন একটা সম্পদ, আমাদের দেশের এবং জাতির। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বনকে উজাড় করে দিয়েছে, ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই বনকে রক্ষার জন্য একটি বন গবেষণা অত্যন্ত জরুরি, যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।"
এই বিতর্কে সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংসদীয় প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক আলোচনার গুরুত্ব এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এসেছে।



